ছবি ভিডিও ভিডিও
বিশেষ প্রতিবেদন, সারা দেশ

নয় মাসে এলপিজির দাম বেড়েছে ৭১৯ টাকা

প্রকাশিত: সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ | ৭:৫৩ অপরাহ্ণ



পঞ্চখণ্ড আই ডেস্ক | বিশেষ প্রতিবেদন: রান্নার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে সাধারণ মানুষের সংসার খরচ। মাত্র নয় মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম বেড়েছে ৭১৯ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে ১ হাজার ৩৪১ টাকার সিলিন্ডারের দাম নভেম্বর মাসে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৫৩.৬ শতাংশ।

পাইপলাইনের গ্যাস-সুবিধাবঞ্চিত অসংখ্য পরিবারের রান্নার প্রধান অবলম্বন এলপিজি। ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পারিবারিক বাজেটে।

নয় মাসের মূল্যচিত্র

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ঘোষিত দর অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল মার্চে ১,৩৪১ টাকা, এপ্রিলে ১,৭২৮ টাকা, মে মাসে ১,৯৪০ টাকা, জুনে ১,৮৮৫ টাকা, জুলাইয়ে ১,৫২৮ টাকা, আগস্টে ১,৫৯৮ টাকা, সেপ্টেম্বরে ১,৫৮৫ টাকা, অক্টোবরে ১,৮৩৭ টাকা এবং নভেম্বরে ২,০৬০ টাকা।

কয়েক দফা দাম কমলেও সামগ্রিক হিসাবে ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে ৭১৯ টাকা। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে একবারে ৩৮৭ টাকা এবং অক্টোবর-নভেম্বর মিলিয়ে ৪৭৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, নাকি দেশীয় বাজারের দুর্বলতা?

এলপিজির প্রধান উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য, সৌদি আরামকোর মাসিক চুক্তিমূল্য, ডলারের বিনিময় হার ও জাহাজভাড়ার ভিত্তিতে বিইআরসি প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করে।

এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানানো হয়েছিল। নভেম্বরেও সৌদি চুক্তিমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব বাস্তব হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, আমদানি ব্যয়ের প্রতিটি পরিবর্তনের চাপ কেন সরাসরি ভোক্তাকে বহন করতে হবে? আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল ভোক্তা কতটা দ্রুত পান? আমদানি থেকে বিপণন পর্যন্ত ব্যয় ও মুনাফার হিসাব কতটা স্বচ্ছ?

নির্ধারিত দামে মিলছে না গ্যাস

এলপিজি বাজারের বড় সমস্যা সরকারি নির্ধারিত দাম ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান। এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১,৭২৮ টাকা নির্ধারিত দামের সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রির তথ্য উঠে আসে।

অন্যদিকে ৫ অক্টোবর বাজার অনুসন্ধানে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রির তথ্য প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণ থাকলেও বাজারে তা কার্যকর হচ্ছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, নির্ধারিত দামের বেশি আদায় ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা কোথায়?

সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবু সংকট কেন?

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশে এলপিজির সামগ্রিক সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে উল্লেখ করেন। কোথাও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদন্তে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেন।

এদিকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে।

তাহলে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও খুচরা বাজারে সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ কেন? আমদানিকারক, পরিবেশক ও বিক্রেতা পর্যায়ে মজুত, ক্রয়মূল্য এবং মুনাফার হিসাব কি যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে?

পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ

মার্চের তুলনায় প্রতি সিলিন্ডারে ৭১৯ টাকা বাড়ায় মাসে একটি সিলিন্ডার ব্যবহারকারী পরিবারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৮ টাকা। মাসে দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার করলে এই বাড়তি ব্যয় ১৭ হাজার ২৫৬ টাকা।

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করছে।এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিয়ানীবাজারের পরিবারগুলোর ওপরও পড়ছে।

ভোক্তার স্বস্তি নিশ্চিত করবে কে?

এলপিজির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। তবে কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ বন্ধ করাও জরুরি। বিইআরসি, জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় হলেও নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে একই রকম কঠোরতা দেখা যায় না কেন?

রান্নার জ্বালানি বিলাসদ্রব্য নয়, এটি মানুষের মৌলিক দৈনন্দিন প্রয়োজন। তাই শুধু মূল্য ঘোষণা নয়, ন্যায্য দাম ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

দাম বাড়ানোর হিসাব হচ্ছে নিয়মিত, এবার ভোক্তার স্বস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্বও নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।