ছবি ভিডিও ভিডিও
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

বিয়ানীবাজারে এইচএসসি ফলাফলে বিপর্যয়, অর্ধেকের বেশি ফেল: শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১:১১ অপরাহ্ণ



পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক : বিয়ানীবাজারের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় উপজেলার ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ফলাফল সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। মোট ২ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১ হাজার ১১২ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ১ হাজার ১২৪ জন। পাসের হার ৪৯.৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ ফেল করেছে ৫০.২৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয়, ছয়টি প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র চারজন। চারজনই বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি।

ছয় প্রতিষ্ঠানের ফলাফল: ৫টিতে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে

প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ থেকে ১ হাজার ২৮৪ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৮০২ জন, ফেল করেছে ৪৮২ জন। পাসের হার ৬২.৪২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে চারজন।

বিয়ানীবাজার মহিলা কলেজের ৩১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৯৯ জন, ফেল করেছে ২১৫ জন; পাসের হার ৩১.৫৩ শতাংশ।

বৈরাগীবাজার কলেজের ১৪৯ জনের মধ্যে পাস করেছে ৬০ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ৮৯ জন; পাসের হার ৪০.২৭ শতাংশ।

দুবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০১ জনের মধ্যে পাস করেছে ৬২ জন, ফেল করেছে ১৩৯ জন; পাসের হার ৩০.৮৫ শতাংশ।

সৈয়দ নবীব আলী কলেজের ২০৮ জনের মধ্যে পাস করেছে ৬৮ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ১৪০ জন; পাসের হার ৩২.৬৯ শতাংশ।

অন্যদিকে বিয়ানীবাজার বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৮০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২১ জন, ফেল করেছে ৫৯ জন; পাসের হার ২৬.২৫ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটির পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। বিশেষ করে মহিলা কলেজ, দুবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফলাফল পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ফলাফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে যে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা জরুরি

এবারের ফলাফলকে কেবল শিক্ষার্থীদের মেধা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি হিসেবে দেখলে প্রকৃত সংকট আড়ালে থেকে যাবে। শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা ও অনুপস্থিতি, শিক্ষকদের দায়সারা মনোভাব, অভিভাবকদের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং সাধারণ শিক্ষার তুলনায় IELTS-মুখী প্রবণতা—এসব বিষয় ফলাফল বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার।

শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগিতা ও অনুপস্থিতি:

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকা, শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগিতা এবং পাঠ্যবিষয়ের প্রতি অনীহা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কেউ কেউ নিয়মিত পাঠ গ্রহণের পরিবর্তে পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শিক্ষকদের দায়সারা মনোভাব:

শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও পাঠদানের কার্যকারিতার ওপর। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠদানে অনীহা, নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ না করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ নজর না দেওয়া এবং নিয়মিত মূল্যায়নের অভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষকতার দায়িত্ব শুধু ক্লাস নেওয়া নয়; শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিভাবকদের তদারকির ঘাটতি:

সন্তান কলেজে যাচ্ছে কি না, নিয়মিত ক্লাস করছে কি না এবং পড়াশোনায় যথেষ্ট সময় দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অনেক অভিভাবকের নজরদারি পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের শিক্ষাজীবনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও অভিভাবকদের দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে শিক্ষার্থীদের অনিয়ম সময়মতো চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

IELTS-মুখী প্রবণতা ও সাধারণ শিক্ষায় অনীহা:

বিয়ানীবাজারের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা অভিবাসনের প্রস্তুতি হিসেবে IELTS শেখার আগ্রহ বাড়ছে। ইংরেজি ভাষা শেখা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু IELTS প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে কেউ যদি কলেজের নিয়মিত ক্লাস, পাঠ্যসূচি ও বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতিকে অবহেলা করে, তবে তা উদ্বেগের বিষয়। ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত রাখাও জরুরি। IELTS কোনোভাবেই সাধারণ শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।

প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসন কি দায় এড়াতে পারে?

শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, শিক্ষকদের পাঠদানের দুর্বলতা কিংবা অভিভাবকদের তদারকির অভাব—এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ ও সমাধানে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত একাডেমিক তদারকি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অভিভাবক সমাবেশ এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা থাকলে অনেক সমস্যা আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

একই সঙ্গে পরিচালনা কমিটির দায়িত্বও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল উন্নয়নে তারা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তা পর্যালোচনা করা দরকার। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের কাছেও জানতে হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান ও ফলাফল পর্যবেক্ষণে কী ধরনের তদারকি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

এখন প্রয়োজন পর্যালোচনা ও জবাবদিহি

বিয়ানীবাজারের শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু ফলাফল প্রকাশের পর আনুষ্ঠানিক আলোচনা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিগত পাঁচ বছরের ফলাফল তুলনা, বিষয়ভিত্তিক পাস-ফেলের পরিসংখ্যান, শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হবে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, সেগুলোর একাডেমিক ব্যবস্থাপনা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষদের কাছ থেকে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জানতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের পাঠদান তদারকি, নিয়মিত অভিভাবক সভা, মাসিক মূল্যায়ন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস চালু করতে হবে।

শিক্ষার সংকটে আত্মসমালোচনা জরুরি

বিয়ানীবাজারের শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। এ জনপদের অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সেই জনপদের ছয়টি প্রতিষ্ঠানে ২ হাজার ২৩৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ১২৪ জনের অকৃতকার্য হওয়া এবং জিপিএ-৫ মাত্র চারটিতে সীমাবদ্ধ থাকা স্বাভাবিকভাবেই আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

এ ব্যর্থতার দায় এককভাবে কোনো পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমাধান নয়। শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, শিক্ষকদের পেশাগত আন্তরিকতা, অভিভাবকদের তদারকি এবং প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি—সবকিছুর সমন্বয়েই শিক্ষার মান নিশ্চিত হতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি কেবল পরীক্ষার্থী তৈরি করছে, নাকি প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ গড়ে তুলছে?

বিয়ানীবাজারের এবারের ফলাফল সেই প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি এবং কার্যকর সংস্কার। কারণ একটি প্রজন্মের শিক্ষাগত ভিত্তি দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, পুরো সমাজের ভবিষ্যতের ওপর পড়ে।