
পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার: মাদক, চুরি, শিশু নিরাপত্তা এবং সরকারি সেবাব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বিয়ানীবাজারে জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পৃথক এসব ঘটনায় অভিযোগের ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয় অভিন্ন—ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ ও অনিয়ম প্রতিরোধে আগাম নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শিশু নিরাপত্তা: পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের দায় কতটা?
সম্প্রতি খাশির নায়াবাড়িতে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তার চাচাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাকে লক্ষ্মীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং বিষয়টি বিচারাধীন। ফলে আদালতের সিদ্ধান্তের আগে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই।
তবে ঘটনাটি শিশু সুরক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সামনে এনেছে। পরিবারের সতর্কতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা, স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রে বাস্তবে কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিযোগ, তদন্তের দাবি
বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনেরা চিকিৎসাসেবায় অবহেলার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসকের সেবা পাওয়া যায়নি।
এটি গুরুতর অভিযোগ। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব যথাযথ তদন্তের। চিকিৎসকের উপস্থিতি, জরুরি সময়ে সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হলে প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি সেবা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রও সামনে আসবে।
মাদক ও চুরি: প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
বিয়ানীবাজারে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। শুধু মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তার দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহের পথ, বিক্রয়কেন্দ্র এবং এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও যুক্ত করা জরুরি।
চুরির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কোন এলাকাগুলো অপরাধপ্রবণ, কোন সময়ে ঘটনা বেশি ঘটে এবং এসব এলাকায় পুলিশের টহল বা নজরদারি কতটা রয়েছে—এসব তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের সরাসরি যোগাযোগ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
নজরদারি নয়, প্রয়োজন জবাবদিহিও
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও জননিরাপত্তার সঙ্গে প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বও যুক্ত। কোনো ঘটনার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি একই ধরনের ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, সে জন্য কারণ শনাক্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বিয়ানীবাজারের আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা, অপরাধের তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ
সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিয়ানীবাজারের জননিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, চুরি প্রতিরোধ ও শিশু সুরক্ষার বিষয়গুলো তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন।
প্রশ্নটি কেবল কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো বা ঘটনার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো—তা নয়। বরং অপরাধের আগাম তথ্য কীভাবে পাওয়া যাচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কতটা নজরদারিতে রয়েছে, সরকারি সেবায় অভিযোগের প্রতিকার হচ্ছে কি না এবং দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে—এসব বিষয়ও এখন আলোচনায় আনা প্রয়োজন।




