
নতুন জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ কার্যত অকার্যকর হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পেলে এসব অধ্যাদেশ আইনি কার্যকারিতা হারাবে এবং তখন সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ অর্থহীন হয়ে পড়বে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ তথ্য জানান।
পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, সেই সময়টা ছিল অনেকটা রোলার কোস্টারে চড়ার মতো—উত্তেজনা, রোমাঞ্চ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। তবে সরকারের তিনটি প্রধান লক্ষ্য ছিল—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলো।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অধিকাংশ সংস্কারমূলক উদ্যোগ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু সংসদের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন না পেলে সেগুলো কার্যকারিতা হারাবে। তবে এগুলোকে আইনে পরিণত করা সরকারের জন্য কঠিন হবে না বলে তিনি মনে করেন, কারণ এসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করা হয়নি এবং সংবিধানবিরোধী কোনো বিধানও রাখা হয়নি।
আসিফ নজরুলের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে ১৪টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত এবং বাকি ১১৯টি মূলত সংস্কারধর্মী। এর মধ্যে ৩৮টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে আইন মন্ত্রণালয়।
তিনি বলেন, এসব অধ্যাদেশের লক্ষ্য ছিল মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ইতোমধ্যে এর কিছু ইতিবাচক ফলও দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আইনগত সহায়তা–সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির হার অন্তত তিন গুণ বেড়েছে। এছাড়া দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধির সংস্কারের ফলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত হয়েছে।
পোস্টে তিনি আরও জানান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন, বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করা, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, মানব পাচার প্রতিরোধ, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এসব অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন পেলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন সাবেক এই আইন উপদেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সংস্কার প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তা বাস্তবায়নের এখতিয়ার সরকারের ছিল না। ফলে সেসব সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
আসিফ নজরুল আশা প্রকাশ করেন, অতীতের মতো এবারও নতুন সংসদ প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।