
পঞ্চখণ্ড আই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। সিলেটের সীমান্তঘেঁষা ও প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজার উপজেলাও এর ব্যতিক্রম নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন এলেই এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধী চক্র, বাড়ে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও নাশকতার আশঙ্কা। এই বাস্তবতায় বিয়ানীবাজার থানায় দায়িত্ব পালনকারী অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ওমর ফারুকের ভূমিকা এখন স্থানীয়ভাবে বিশেষভাবে আলোচিত।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থানা-চিত্র?
২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর বিয়ানীবাজার থানার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ওসি ওমর ফারুক থানা ব্যবস্থাপনায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনেন। অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও অভিযান—প্রতিটি ক্ষেত্রে সমন্বিত টিমওয়ার্কের ওপর জোর দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ব্যবস্থাপনার ফলে থানার কার্যক্রমে আগের চেয়ে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে।
অপরাধ দমনের পরিসংখ্যান
থানা সূত্র ও পুলিশ রেকর্ড তথ্য অনুযায়ী— বিয়ানীবাজার থানায় মাদক মামলা: ১৯টি ও চোরাচালান মামলা: ০৮টি। উদ্ধারকৃত অবৈধ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে * ইয়াবা: ৩,৫৭২ পিস ( মূল্য প্রায় ১০.৭৮ লাখ টাকা), * গাঁজা: ১ কেজি, * মদ: ১৫ বোতল, * ভারতীয় বিড়ি: ১,৮২,০০০ শলাকা, * ভারতীয় মেহেদি: ২,৮৮০ পিস, * ভারতীয় তারাবাতি: ৩৪,৫০০ শলাকা ও * ভারতীয় জিরা: ৪,৭৬০ কেজি (মূল্য প্রায় ২৩.৮০ লাখ টাকা)। আর জব্দকৃত যানবাহনের মধ্যে রয়েছে- সিএনজি ৩টি, মোটরসাইকেল ১টি, পিকআপ ১টি, নোহা ১টি।
আলোচিত মামলার অগ্রগতি
বৈরাগীবাজারের আলোচিত ইমন হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করে দুইজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সোর্স তথ্যের ভিত্তিতেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
শীতকালীন নিরাপত্তায়: রাতের টহল
শীতের মৌসুমে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ রাতের টহল জোরদার করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওসি মো. ওমর ফারুক নিজেই গভীর রাতে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে টহল কার্যক্রম মনিটরিং করছেন। মহাসড়কসংলগ্ন এলাকা, বাজারকেন্দ্র ও নিরিবিলি জনপদে চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল বাড়ানো হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জোরদার করেছে।
নির্বাচনের লক্ষ্যে জনমুখী পুলিশিং
সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিয়ানীবাজার উপজেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় জনমুখী ও প্রতিরোধমূলক পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করেছেন ওসি ওমর ফারুক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে আগাম নজরদারি, রাজনৈতিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ, রাতভিত্তিক টহল ও গোপন তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুধীজনদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন উত্তেজনা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়—সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের এই আগাম প্রস্তুতির ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
ভয়ের জায়গায় ভরসা ও প্রতিক্রিয়া
পঞ্চখণ্ড আই–এর অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে পুলিশকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা ছিল, সেখানে এখন অনেকেই সরাসরি থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “এখন পুলিশকে ফোন করলে আগের চেয়ে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়। বিশেষ করে রাতে টহল বাড়ায় আমরা স্বস্তিতে আছি।”
টিমওয়ার্কই শক্তি
পুলিশ সূত্র জানায়, সিলেট জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনায় ওসি ওমর ফারুক এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলদের নিয়ে একটি কার্যকর অপারেশন টিম গড়ে তুলেছেন। এই টিমের সমন্বিত অভিযানের ফলেই একের পর এক অপরাধ দমন সম্ভব হচ্ছে।
কী বলছেন ওসি ওমর ফারুক
“নির্বাচন হোক বা স্বাভাবিক সময়—আমাদের লক্ষ্য একটাই, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পুলিশ জনগণের বন্ধু, তবে অপরাধীদের জন্য কোনো ছাড় নেই।”
বিশ্লেষণ: প্রস্তুতি কতটা কার্যকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে আগাম নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। বিয়ানীবাজার থানায় বর্তমানে যে জনমুখী পুলিশিং কার্যক্রম চলছে, তা সঠিকভাবে অব্যাহত থাকলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
পঞ্চখণ্ড আই–এর অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হচ্ছে, ওসি মো. ওমর ফারুকের নেতৃত্বে বিয়ানীবাজার থানায় অপরাধ দমন, শীতকালীন নিরাপত্তা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক শান্তি রক্ষায় যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। এখন দেখার বিষয়—এই ধারাবাহিকতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নির্বাচন পর্যন্ত শান্তি ও শৃঙ্খলা কতটা বজায় থাকে।