
Π আতাউর রহমান :
শিক্ষার্থীর সাফল্য কেবল পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এই সত্যটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা যেমন সিঙ্গাপুরেও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের একজন প্রিন্সিপাল অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে লিখিত চিঠিতে বলেছেন, “আপনার সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল তার সম্ভাবনার মাপ নয়। প্রতিটি শিশুর আলাদা প্রতিভা, স্বপ্ন ও আগ্রহ আছে। অভিভাবকরা তাদের নম্বরের চেয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশকে প্রাধান্য দিন।” এই বার্তাটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত শিক্ষণীয়।
বাংলাদেশে এখনও অনেক অভিভাবক পরীক্ষার ফলাফলকে সন্তানের একমাত্র মূল্যায়নের মানদণ্ড মনে করেন। ভালো নম্বর পেলে প্রশংসা, কম নম্বর পেলে দোষারোপ—এই মানসিক চাপ শিশুর আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন চিত্রশিল্পীর জন্য গণিত, একজন সঙ্গীতজ্ঞের জন্য রসায়ন, কিংবা একজন ক্রীড়াবিদর জন্য পদার্থবিজ্ঞান প্রধান বিষয় নয়। কিন্তু প্রায়শই সমাজে এই সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীর মনোবল কমিয়ে দেয়।
বাস্তব উদাহরণ আছে, যারা স্কুলে বা কলেজে তুলনামূলকভাবে ভালো নম্বর পায়নি, তবুও জীবনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। জাতীয় ক্রিকেটার, সঙ্গীতজ্ঞ, উদ্যোক্তা বা বিজ্ঞানী—অনেকেই প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার ফলাফলে গণ্ডিতে ছিল না। বাংলাদেশে অনেক ক্রিকেটার ও খেলোয়াড় শিক্ষার ধারাবাহিকতা কম হলেও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। ঠিক তেমনই, একজন চিত্রশিল্পী বা উদ্যোক্তা, যিনি স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে গণিত বা ইতিহাসে সেরা নন, তারপরেও দেশ ও সমাজের জন্য নতুন উদ্ভাবন এবং সৃজনশীল উদ্যোগ গড়ে তুলতে সক্ষম। এই বাস্তব উদাহরণগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষার মান শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
অভিভাবকদের উচিত, সন্তানের নম্বর বা পরীক্ষার ফলাফলের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার চেয়ে, তাদের স্বপ্ন, আগ্রহ ও চেষ্টাকে মূল্যায়ন করা। তাদের শেখাতে হবে যে ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা এবং সৃজনশীলতা বজায় রাখা। বিদ্যালয় ও অভিভাবকের সমন্বিত দায়িত্ব শিশুর মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশে অপরিহার্য।
শিক্ষার্থীর মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশের জন্য বিদ্যালয় ও অভিভাবকের সমন্বিত দায়িত্ব অপরিহার্য। শিক্ষকরা পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে শিশুর বৌদ্ধিক বিকাশে সহায়ক হলেও, অভিভাবকরা ঘরে শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও নিরাপদ মনোভাব নিশ্চিত করতে পারেন। সিঙ্গাপুরের প্রিন্সিপালের বার্তা আমাদের শেখায়, একটি পরীক্ষার ফলাফল কেবল একটি সূচক; শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশই প্রকৃত শিক্ষা।
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অভিজ্ঞতা থেকে বলার মতো একটি সত্য হলো, সন্তানদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের প্রচেষ্টা স্বীকৃতি দেওয়া, এবং ফলাফলের তুলনায় মর্যাদা ও ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেওয়া—এটাই তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি সফলতার মূল চাবিকাঠি। যদি অভিভাবকরা এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, তবে বাংলাদেশে আগামী প্রজন্ম কেবল শিক্ষিত নয়, আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল এবং নৈতিকভাবে শক্তিশালী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
পরিশেষে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর নম্বরের চেয়ে তার সম্ভাবনার বিকাশ, যেন তারা পরীক্ষার বাইরে জীবনেও সাফল্য ও মর্যাদা অর্জন করতে পারে। সিঙ্গাপুরের প্রিন্সিপালের বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি পরীক্ষার ফলাফল কেবল একটি সূচক; শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশই প্রকৃত শিক্ষা। যদি অভিভাবকরা এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, তবে বাংলাদেশে আগামী প্রজন্ম কেবল শিক্ষিত নয়, আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল এবং নৈতিকভাবে শক্তিশালী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।