
-Π আতাউর রহমান
বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক উত্তাপ, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে এগোতে থাকা এই সময়টায় গণতন্ত্র, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের আশা-ভরসা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক বড় রাজনৈতিক মুহূর্ত। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রচিন্তার কিছু কালজয়ী উক্তি আমাদের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তোলে—গণতন্ত্র কি সত্যিই জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য কাজ করছে? রাজনীতি কি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত? আর জ্ঞান ও তথ্য কি সমাজকে সচেতন করছে, নাকি বিভ্রান্ত করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টাই এই লেখাটির মূল লক্ষ্য।
আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত উক্তি— “Democracy is a government of the people, by the people and for the people”—গণতন্ত্রের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর সংজ্ঞা। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংজ্ঞাই আবার নতুন করে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন একটাই—এই নির্বাচন কি সত্যিকার অর্থে জনগণের অংশগ্রহণ, মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে, নাকি এটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক একটি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে? গণতন্ত্রের শক্তি কাগজে নয়, মাঠে—ভোটারদের আস্থা, অংশগ্রহণ ও স্বাধীন মত প্রকাশের মধ্যেই তার আসল পরীক্ষা হয়। নির্বাচনী রাজনীতি যদি আস্থার সংকট কাটাতে না পারে, তবে “জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য” রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণাটিও ক্রমে ফাঁপা হয়ে পড়বে।
অ্যারিস্টটলের উক্তি— “Man is a political animal”—মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি মানুষের জীবন থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয়। আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনে রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট—দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট সবই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট, প্রত্যাশা ও নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভোটের মাঠে যদি এসব বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন না ঘটে, তবে রাজনীতি ধীরে ধীরে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, আর সেই বিচ্ছিন্নতাই জন্ম দেয় অনাস্থা ও অসন্তোষের।
ফ্রান্সিস বেকনের উক্তি— “Knowledge is power” —আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। আজকের বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারে খবরের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অপতথ্য, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। জ্ঞান ও তথ্য এখন শুধু শক্তি নয়, এটি নির্বাচনী রাজনীতির একটি প্রধান অস্ত্র। প্রশ্ন হলো, এই শক্তি ব্যবহৃত হবে কি ভোটারকে সচেতন করতে, নাকি বিভ্রান্ত করতে? যদি তথ্যের জায়গা দখল করে নেয় অপপ্রচার, তবে ভোটারের স্বাধীন মত গঠন বাধাগ্রস্ত হবে এবং নির্বাচন তার গণতান্ত্রিক অর্থ হারাতে বসবে। তাই এই সময়ে দায়িত্বশীল রাজনীতি ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম—দুটোরই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই তিনটি উক্তি একসঙ্গে আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটের দিন নয়, রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়, আর জ্ঞান মানে কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়। আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি গণতান্ত্রিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সত্যভিত্তিক তথ্যচর্চা।
নইলে উক্তিগুলো থেকে যাবে বইয়ের পাতায় বা দেয়ালের লেখায়, আর বাস্তব রাজনীতি চলবে ভিন্ন পথে। তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই—যাদের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি জড়িত।