Eng
উপসম্পাদকীয়

আমরা খরচের ফর্দ মনে রাখি, আর মানুষ হওয়ার ফর্দটি ভুলে যাই —✍️ আতাউর রহমান

প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ



আকাঙ্ক্ষার ভিড়ে মূল্যবোধের বিস্মরণ

মানুষ কী কিনবে, কত খরচ করবে, কোথায় বাড়ি করবে, কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে—এসবের হিসাব খুব যত্নে রাখে। অথচ কেমন মানুষ হবে, কোন অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখবে, অন্যের প্রতি কতটা ন্যায়বান থাকবে—এই হিসাবটিই অনেক সময় হারিয়ে যায়।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘কাজের ছেলে’ কবিতার শিশুটি মায়ের দেওয়া বাজারের ফর্দ মনে রাখতে রাখতে পথে বেরোয়। কিন্তু খেলাধুলা, ঘুড়ি ও পথের নানা আকর্ষণে তার মন বারবার বিচ্যুত হয়। শেষ পর্যন্ত ফর্দের জিনিসগুলোই এলোমেলো হয়ে যায়। শিশুর এই সরল ভুলের মধ্যে জীবনের একটি গভীর শিক্ষা আছে—পথের আকর্ষণীয় প্রলোভনে মানুষ তার মূল উদ্দেশ্য অনেক সময় ভুলে যেতে পারে।

আমাদের জীবনও এমন একটি দীর্ঘ পথ। শৈশবে আমরা শিখি সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা ও সংযমের কথা। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফর্দে যোগ হয় অর্থ, পদ, প্রতিপত্তি ও সামাজিক স্বীকৃতির হিসাব। সমস্যা আকাঙ্ক্ষায় নয়; সমস্যা তখনই, যখন আকাঙ্ক্ষা মূল্যবোধকে গ্রাস করে।

মানুষ স্বপ্ন দেখবে, ভালো থাকতে চাইবে, সাফল্য অর্জন করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাফল্যের পথে কোন সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না, সেই বোধটিই তাকে মানুষ করে। অর্থ উপার্জন অপরাধ নয়; অন্যের অধিকার নষ্ট করে অর্থ উপার্জনই প্রশ্নের জন্ম দেয়। ক্ষমতা নিজে সমস্যা নয়; ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক ভুলে যাওয়াই বিপজ্জনক।

আমাদের সময়ের বড় সংকট তাই সম্পদের অভাব নয়—নৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট।

আমরা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতন। ঘর পরিষ্কার করি, পোশাক পরিষ্কার রাখি, উপাসনালয়ের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সতর্ক থাকি। অথচ নিজের অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করার প্রয়োজনটি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

এটি শুধু ধর্মীয় আচারের প্রসঙ্গ নয়; বরং আত্মপরীক্ষার একটি কঠিন প্রশ্ন। জুতার ময়লা চোখে দেখা যায়, তাই সেটি খুলে বাইরে রেখে আসি। কিন্তু অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, পরনিন্দা, প্রতারণা কিংবা স্বার্থপরতার ময়লা দেখা যায় না। তাই সেগুলো বহন করেই আমরা পবিত্রতার দাবি করি।

বাহ্যিক শুদ্ধতা আচারে প্রকাশ পায়, অন্তরের শুদ্ধতা প্রকাশ পায় ব্যবহারে।

একজন মানুষ নামাজ পড়েন—এটি তাঁর ধর্মীয় অনুশীলন। কিন্তু সেই অনুশীলনের নৈতিক প্রতিফলন কোথায়? তিনি দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, অধীনস্থের অধিকার কতটা মানেন, অন্যের সম্পদ ও সম্মান কতটা নিরাপদ রাখেন, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন কি না—এসব প্রশ্নের মধ্যেই মূল্যবোধের বাস্তব পরীক্ষা। সেজদার জায়গা পরিষ্কার রাখা জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি সেই হৃদয়, যে হৃদয় সেজদায় নত হয়।

ক্ষমার ক্ষেত্রেও একই সত্য। ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়, বিচারকে অস্বীকার করাও নয়। বরং ক্ষতকে প্রতিহিংসার স্থায়ী বাসস্থান হতে না দেওয়া। মানুষ অন্যের অপরাধের বিচার চাইতে পারে, নিজের সীমারেখা রক্ষা করতে পারে; কিন্তু নিজের ভেতরে ঘৃণা জমিয়ে রেখে শান্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। ক্ষমা অনেক সময় অন্যকে মুক্ত করার চেয়ে নিজেকে মুক্ত করার নাম।

একটি সমাজের চরিত্রও গড়ে ওঠে এমন অসংখ্য ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর। আইন অপরাধের শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু অপরাধ করার আগে বিবেক মানুষকে থামায়। প্রতিষ্ঠান নিয়ম তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই নিয়মের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করে মূল্যবোধ।

তাই মূল্যবোধের শিক্ষা শুধু বইয়ের পাঠ নয়। পরিবারে শিশুর সঙ্গে আচরণ, শিক্ষকের ন্যায়পরায়ণতা, অভিভাবকের সততা, নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ এবং সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি আমাদের ব্যবহার—সবই একেকটি জীবন্ত পাঠশালা।

আমরা সন্তানকে বলি, ‘ভালো ফল করো’, ‘ভালো চাকরি করো’, ‘বড় হও’। কিন্তু এর সঙ্গে যদি না বলি—‘সৎ থেকো’, ‘অন্যের অধিকার সম্মান করো’, ‘ক্ষমতা পেলে বিনয়ী থেকো’, ‘সফল হলেও মানুষকে ছোট করো না’—তাহলে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অপূর্ণ থেকে যায়। কারণ শিক্ষিত হওয়া আর মানুষ হওয়া এক কথা নয়।

‘কাজের ছেলে’ কবিতার শিশুটি বাজারের ফর্দ গুলিয়ে ফেলে—সেটি হাসির বিষয়। কিন্তু আমাদের জীবনের ফর্দ যদি গুলিয়ে যায়, তার পরিণতি হাস্যকর নয়। যখন অর্থ সততার ওপরে উঠে যায়, স্বার্থ ন্যায়ের ওপরে বসে, প্রতিযোগিতা সহমর্মিতাকে সরিয়ে দেয় এবং বাহ্যিক ধর্মাচরণ অন্তরের নৈতিকতাকে আড়াল করে—তখন মানুষ হয়তো অনেক কিছু অর্জন করে, কিন্তু ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান পরিচয়টি। মানুষ হওয়ার ফর্দটি।

জীবনের শেষ হিসাব তাই শুধু কতটুকু অর্জন করেছি, তা দিয়ে হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—কী অর্জন করতে গিয়ে কী হারিয়েছি? কতটা সম্পদ বাড়িয়েছি, তার পাশাপাশি কতটা বিশ্বাস অর্জন করেছি? কতটা পরিচিত হয়েছি, তার পাশাপাশি কতটা মানুষের উপকারে এসেছি? কতটা উঁচুতে উঠেছি, তার পাশাপাশি কাউকে নিচে নামিয়ে উঠেছি কি না?

মসজিদের মেঝে পরিষ্কার করা সহজ; নিজের মন পরিষ্কার করা কঠিন। কারণ মেঝের ময়লা অন্যের চোখে পড়ে, মনের ময়লা লুকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু মানুষকে শেষ পর্যন্ত চেনা যায় তার লুকানো জায়গাগুলোতেই—তার একান্ত সিদ্ধান্তে, ক্ষমতার ব্যবহারে, দুর্বল মানুষের সঙ্গে আচরণে এবং নিজের স্বার্থের সামনে নীতিকে কতটা অটুট রাখে, তাতে।

জীবনের পথে ঘুড়ি থাকবে, খেলা থাকবে, প্রলোভন থাকবে, সাফল্যের হাতছানি থাকবে। সবকিছুকে অস্বীকার করে মানুষ হওয়া যায় না। বরং প্রয়োজন—সব আকাঙ্ক্ষার মাঝেও নিজের মূল ফর্দটি মনে রাখা।

সেই ফর্দে হয়তো বড় কোনো সম্পদের নাম নেই। আছে সত্য, ন্যায়, মমতা, সংযম, ক্ষমা ও বিবেক।

দিন শেষে বাজারের ব্যাগে চাল-ডাল-তেল সবই থাকতে পারে; ব্যাংকে থাকতে পারে অর্থ, ঘরে থাকতে পারে সম্পদ, নামের পাশে থাকতে পারে পরিচয়ের দীর্ঘ তালিকা। কিন্তু যদি মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা না থাকে, যদি বিবেকের কাছে নিজের উত্তর দেওয়ার সাহস না থাকে, তবে সেই দীর্ঘ অর্জনের তালিকাও অসম্পূর্ণ।

কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় হিসাবটি টাকার নয়—মানুষ হয়ে ওঠার।

আর সবচেয়ে বড় বিস্মরণও কোনো বাজারের জিনিস ভুলে যাওয়া নয়; মানুষ হওয়ার ফর্দটি যেন পথে হারিয়ে না যায়।