
● এক প্রস্তাবে উপজেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে পুকুর-ডোবাসহ ৫৬ শতক ● অন্যটিতে কেন্দ্রের ২ কিলোমিটারের মধ্যে ৬৫ শতক জমি
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার: বিয়ানীবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছে দুটি প্রস্তাব বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। এর একটি কামারগ্রাম মৌজায় ৫৬ শতক জমি এবং অন্যটি খাসাড়ীপাড়া মৌজায় ৬৫ শতক জমি।
সরকারি নথি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ২০২১ সালের স্থান নির্বাচন-সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্টদের পূর্ববর্তী যাচাইয়ের তথ্য বিবেচনায় খাসাড়ীপাড়ার প্রস্তাবটি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, জমির পরিমাণ, উপজেলা কেন্দ্রের নিকটবর্তী অবস্থান, কেবলা, প্রবেশপথ, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস এবং মসজিদ কমিটির নামীয় মালিকানাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় ইতোমধ্যে যাচাই করা হয়েছে।
দুই প্রস্তাবের অবস্থান ও জমির ধরনে পার্থক্য
১৬ সেপ্টেম্বরের সরকারি নথিতে উপজেলা ভূমি অফিসের মাধ্যমে কামারগ্রাম মৌজার ৫৬ শতক জমির একটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ রয়েছে। জে.এল. নং ১৮-এর ৫৫৮, ৫৫৯ ও ৫৬৩ নম্বর দাগের এই জমির মধ্যে আড়োয়াল শাহ জামে মসজিদ কমিটির পক্ষে ২০ শতক মসজিদ শ্রেণির, ১৯ শতক পুকুর এবং ১৭ শতক ডোবা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি রোডম্যাপ অনুযায়ী, স্থানটি বিয়ানীবাজার উপজেলা কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, উপজেলা সদরের আশপাশে উপযুক্ত জায়গা না পাওয়ায় ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ জমির প্রস্তাব পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, খাসাড়ীপাড়া মৌজার প্রস্তাবিত জমিটি বিএস খতিয়ান নং ১৩২, নামজারি খতিয়ান নং ৪৭০ এবং ১২৭ নম্বর দাগে অবস্থিত। জমির শ্রেণি ‘বাড়ী’এবং প্রস্তাবিত পরিমাণ ০.৬৫ একর বা ৬৫ শতক। স্থানটি বিয়ানীবাজার উপজেলা কেন্দ্রের দুই কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত।
ফলে দুটি প্রস্তাবের মধ্যে শুধু দূরত্বের নয়, জমির শ্রেণি ও বর্তমান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় গুরুত্ব
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের ৫ মে ২০২১ সালের স্থান/জমি নির্বাচন-সংক্রান্ত নির্দেশনায় মডেল মসজিদের জন্য ন্যূনতম ৪০ শতক জমির কথা বলা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সের ১–২ কিলোমিটারের মধ্যে অথবা জেলা শহর/শহরতলির প্রশস্ত রাস্তার পাশে জমি নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া জমির ধরন, রাস্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। নির্দেশনায় প্রয়োজন হলে একাধিক প্রস্তাব পাঠানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।
এই নির্দেশনার আলোকে খাসাড়ীপাড়ার ৬৫ শতক জমির অবস্থানগত বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে। কারণ সরকারি গাইডলাইনেই জমিটি উপজেলা কেন্দ্রের দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে এবং প্রস্তাবিত জমির পরিমাণও নির্দেশনায় উল্লেখিত ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে বেশি।
কেবলা ও জমির পরিমাণ আগেই যাচাই
খাসাড়ীপাড়ার প্রস্তাবিত স্থানটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মডেল মসজিদের জন্য বিবেচনার আগে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে কেবলার দিক নির্ধারণ এবং জমির পরিমাণ যাচাই করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় প্রস্তাব পাঠানোর সময় কেবলা ঠিক আছে কি না এবং মসজিদে প্রবেশের রাস্তা ঠিক আছে কি না—এসব তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। খাসাড়ীপাড়ার ক্ষেত্রে কেবলার দিক নিয়ে পূর্ববর্তী যাচাই সম্পন্ন হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনিক মূল্যায়নে বিবেচনার দাবি রাখে।
প্রবেশপথ ও নাগরিক সুবিধা
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাসাড়ীপাড়ার প্রস্তাবিত স্থানে মসজিদে প্রবেশের পথ রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থাও বিদ্যমান। একই সঙ্গে এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ সচল রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মডেল মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এর সঙ্গে ইসলামিক সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ও যুক্ত। ফলে সহজ যোগাযোগ এবং বিদ্যমান নাগরিক সুবিধা প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নামীয় মালিকানার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
খাসাড়ীপাড়ার জমিটির মালিকানা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য রয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত জমিটি খাসাড়ীপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের নামীয় মালিকানাধীন।
তবে সরকারি প্রকল্পের চূড়ান্ত স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু নামীয় মালিকানা নয়, ভূমির রেকর্ড, দখল, শ্রেণি, সীমানা ও অন্যান্য আইনগত বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি কমবে।
কামারগ্রামের প্রস্তাবে পুকুর-ডোবা নিয়ে প্রশ্ন
অন্যদিকে, কামারগ্রামের ৫৬ শতক প্রস্তাবিত জমির মধ্যে পুকুর ও ডোবা শ্রেণির জমি অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মডেল মসজিদের মতো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব জমির উন্নয়নযোগ্যতা, ভরাটের প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশগত বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক নূর উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকায় মডেল মসজিদের জন্য একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন; পরবর্তীতে ওই স্থানে পুকুর শ্রেণির জমি অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে প্রস্তাবটি পরিবেশগত আপত্তির মুখে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে বর্তমান কামারগ্রাম প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও পুকুর ও ডোবা শ্রেণির জমি অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি আগের অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন প্রয়োজন একই মানদণ্ডে যাচাই
১৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আগের প্রস্তাবসহ দুটি প্রস্তাব বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা—দুটি প্রস্তাবই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী একই মানদণ্ডে মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হোক। বিশেষ করে জমির পরিমাণ, কেবলার দিক, প্রবেশপথ, রাস্তার প্রস্থ, মালিকানা, জমির শ্রেণি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের সুবিধা সরেজমিনে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
সংশ্লিষ্টদের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ
বিয়ানীবাজারের মডেল মসজিদকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখন বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসেছে। তাই স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের দাবি নয়, বরং সরকারি গাইডলাইন, ভূমির স্বচ্ছতা, মুসল্লিদের সুবিধা এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি উপযোগিতা যেন মূল বিবেচ্য হয়—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
বিশেষ করে উপজেলা কেন্দ্রের কাছাকাছি ৬৫ শতক খাসাড়ীপাড়া প্রস্তাবিত জমি এবং ১৮ কিলোমিটার দূরের পুকুর-ডোবাসহ ৫৬ শতকের কামারগ্রাম প্রস্তাব—দুটির বাস্তব অবস্থা একই মানদণ্ডে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিনে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে গাইডলাইনসম্মত, নিষ্কণ্টক, মুসল্লিবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদে উপযোগী স্থান নির্ধারণে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।




