
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১৫ আগস্ট এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার ১১৯ জন এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৫৩ হাজার ৪৭৭ জনসহ মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৯৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অবশ্যই এটি দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর। বিশেষ করে অবসরের পর বছরের পর বছর নিজের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় থাকা মানুষের কাছে আংশিক অর্থও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু অর্থ হাতে পাওয়ার পরই নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে—যেগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর এখন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া জরুরি।
প্রথম প্রশ্ন—কে কত টাকা পেলেন এবং কোন হিসাবের ভিত্তিতে?
একই স্কেল, একই সময়ে অবসর গ্রহণ এবং কাছাকাছি চাকরিকাল থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক-কর্মচারী ভিন্ন অঙ্কের অর্থ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চতর স্কেলের শিক্ষক-কর্মচারীর তুলনায় নিম্নতর স্কেলের কেউ বেশি অর্থ পেয়েছেন বলেও প্রশ্ন উঠেছে।
এখানে বিষয়টি শুধু বেশি বা কম টাকা পাওয়ার নয়। অবসর ও কল্যাণ সুবিধা নির্ধারণের সূত্র, হার, চাকরিকাল, শেষ মূল বেতন, কর্তনকৃত চাঁদা এবং প্রযোজ্য বিধিমালা—কোন কোন উপাদান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যেক আবেদনকারীকে জানানো প্রয়োজন।
কারণ, আইন অনুযায়ী অবসর সুবিধা বোর্ডের অন্যতম দায়িত্ব হলো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধা প্রদান এবং সুবিধার হার ও সময়সীমাসহ আনুষঙ্গিক বিষয় নির্ধারণ করা।
তাই প্রত্যেক সুবিধাভোগীর জন্য একটি স্বচ্ছ হিসাব বিবরণী দেওয়া যেতে পারে—যেখানে মোট প্রাপ্য, প্রথম ধাপে প্রদত্ত অর্থ এবং অবশিষ্ট পাওনা আলাদাভাবে উল্লেখ থাকবে। এতে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ—দুটিই কমবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন—ব্যাংক স্টেটমেন্টে খাতের নামের ভিন্নতা কেন?
অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট—দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠান হলেও একই ব্যক্তির প্রাপ্য অর্থের ক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্টে খাতের নাম বা অর্থ প্রদানের পরিচিতি নিয়ে বিভ্রান্তি থাকা কাম্য নয়।
কেউ যদি জানতে চান, তাঁর হিসাবে জমা হওয়া অর্থটি অবসর সুবিধা নাকি কল্যাণ সুবিধা—তাঁকে যেন ব্যাংক স্টেটমেন্ট, এসএমএস কিংবা অনলাইন পোর্টাল দেখেই বিষয়টি বুঝতে পারেন। অর্থের উৎস ও খাতের পরিচয় স্পষ্ট করা আর্থিক স্বচ্ছতার মৌলিক শর্ত।
তৃতীয় প্রশ্ন—অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ কোথায়?
প্রথম ধাপে আংশিক অর্থ দেওয়া হয়েছে—এটি স্বস্তির। কিন্তু যাঁরা তাঁদের প্রাপ্য অর্থের পুরোটা পাননি, তাঁদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বাকি টাকা কবে এবং কীভাবে পাওয়া যাবে?
কল্যাণ ট্রাস্টের নোটিশে যাঁরা কর্তনকৃত ৪ শতাংশের তুলনায় কম অর্থ পেয়েছেন, তাঁদের অবশিষ্ট অর্থ পর্যায়ক্রমে বা সিরিয়াল অনুযায়ী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু শুধু ‘সিরিয়াল অনুযায়ী’ বললেই অবসরপ্রাপ্ত মানুষের অনিশ্চয়তা দূর হয় না। প্রয়োজন একটি সময়সীমাবদ্ধ, প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য পরিশোধ পরিকল্পনা।
কোন সিরিয়াল থেকে কোন সিরিয়াল পর্যন্ত আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, কতজন বাকি, মোট বকেয়া কত এবং বর্তমান অর্থপ্রবাহ অনুযায়ী প্রতি মাসে কতজনের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে সুবিধাভোগীরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবেন।
চতুর্থ প্রশ্ন—শিক্ষকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ভবিষ্যৎ কী?
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে বর্তমানে অবসর সুবিধার জন্য ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ অর্থ কর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ চাকরিজীবনে একজন শিক্ষক-কর্মচারী তাঁর মূল বেতনের মোট ১০ শতাংশ এই দুটি তহবিলে দেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নির্ধারিত অর্থ নেওয়া হয় এবং তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ থেকে আয় হয়।
তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন—এই অর্থের বার্ষিক আয় কত, এফডিআর বা অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে আয় কত, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কত এবং মোট ব্যয়ের পর অবশিষ্ট অর্থ কত?
শিক্ষক-কর্মচারীরা তাঁদের সারা কর্মজীবনে অর্থ দিয়েছেন। ফলে অবসরের পর সেই অর্থের হিসাব জানতে চাওয়া কোনো অনুগ্রহপ্রার্থনা নয়; এটি জবাবদিহিতার স্বাভাবিক দাবি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে অবসর ও কল্যাণ তহবিলের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান ও বকেয়া আবেদন নিয়ে উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে।
প্রয়োজন ‘কার কত’—তার প্রকাশ্য হিসাব
এখন সময় এসেছে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের ওয়েবসাইটে নিয়মিতভাবে কয়েকটি তথ্য প্রকাশের—
১. মোট আবেদনকারী ও নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের সংখ্যা;
২. মোট অনুমোদিত প্রাপ্য অর্থ;
৩. প্রথম ধাপে প্রত্যেক শ্রেণির আবেদনকারীকে প্রদানের ভিত্তি;
৪. অবশিষ্ট পাওনার পরিমাণ;
৫. তহবিলে জমা হওয়া চাঁদার পরিমাণ;
৬. এফডিআর ও অন্যান্য বিনিয়োগের আয়;
৭. শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ;
৮. সরকারি বরাদ্দ ও অন্যান্য উৎসের অর্থ;
৯. প্রশাসনিক ব্যয়সহ মোট ব্যয়; এবং
১০. অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধের সময়সূচি ও সিরিয়ালভিত্তিক অগ্রগতি।
এ ধরনের তথ্য প্রকাশ হলে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে বারবার দপ্তরে গিয়ে নিজের টাকার হিসাব জানতে হবে না।
তথ্যের অধিকার মানে অনিশ্চয়তা দূর করার অধিকারও
তথ্য জানা নাগরিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। বিশেষ করে যে অর্থ শিক্ষক-কর্মচারীদের কর্মজীবনের চাঁদা, নির্ধারিত তহবিল ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে গঠিত, সেই অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলোর সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনভর সঞ্চয় ও অবসরজীবনের নিরাপত্তা জড়িত। আইনেও অবসর সুবিধা বোর্ডকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা প্রদান এবং সুবিধার হার ও সময়সীমা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই এখন প্রয়োজন অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগ নয়, হিসাবের স্বচ্ছতা। প্রয়োজন প্রতিশ্রুতি নয়, সময়সীমাসহ কর্মপরিকল্পনা। প্রয়োজন শুধু আংশিক অর্থ প্রদান নয়, প্রত্যেকের প্রাপ্য অর্থের পূর্ণ নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা।
১৫ আগস্টের অর্থ প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। কিন্তু এই সূচনাকে সফল করতে হলে অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে—কত টাকা বাকি, কারা বাকি, কোন ভিত্তিতে পরিশোধ হবে এবং কবে নাগাদ শেষ হবে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা দয়া চান না; তাঁরা চান তাঁদের কর্মজীবনের প্রাপ্য অর্থের স্বচ্ছ হিসাব ও সময়মতো পূর্ণ পরিশোধ। এই প্রত্যাশার জবাব দেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্বও।
লেখক: আব্দুদ দাইয়ান
সভাপতি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখা।




