
নিজস্ব প্রতিবেদক | বিয়ানীবাজার, সিলেট: সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাইয়ে একের পর এক ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মাদক পরিবহনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের কচকটখা এলাকায় পৃথক দুটি পুলিশি অভিযানে ২ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন চারজন। এর মধ্যে একটি অভিযানে ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসও জব্দ করেছে পুলিশ। একই সময়ে উপজেলার অন্য এলাকাতেও ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে কচকটখা এলাকায় জকিগঞ্জ-সিলেট সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে ১ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ অক্টোবর একই এলাকায় আরেক অভিযানে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে। চারখাইয়ে আগের মাসগুলোতেও বড় চালান আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে এই এলাকার মধ্য দিয়ে মাদক পরিবহনের উৎস, গন্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক নিয়ে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে চারখাই ইউনিয়নের কচকটখা এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে জকিগঞ্জ থেকে সিলেটগামী সড়কে চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় রুবেল আহাম্মদ (৩৮) নামের এক ব্যক্তিকে ১ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দানিখোলা মোড় এলাকায়।
এরপর ৩ অক্টোবর একই এলাকায় চেকপোস্ট পরিচালনা করে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন গোলাপগঞ্জের লায়েক আহমদ (৩৫), জকিগঞ্জের দেলোয়ার হোসেন (৪০) এবং গোলাপগঞ্জের আবু তাহের আবু (২৬)। পুলিশের প্রেস রিলিজে জানানো হয়, ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাসও জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে।
দুটি ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ইয়াবার মোট পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ পিস। তবে এসব চালানের উৎস ও চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত না হওয়ায় সেগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
চারখাইয়ের বাইরেও উদ্ধার ইয়াবা
বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের ২৬ সেপ্টেম্বরের প্রেস রিলিজে বলা হয়, ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে উপজেলার ১০ নম্বর মুড়িয়া ইউনিয়নের ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামে একটি বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে ১৭০ পিস ইয়াবাসহ আব্দুস শুক্কুর (৪২) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর উপজেলার ৪ নম্বর শেওলা ইউনিয়নের কাকরদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে জামাল মিয়া (৪৭) নামের এক ব্যক্তিকে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নতুন মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আগের কয়েকটি মামলাও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে প্রেস রিলিজে উল্লেখ করা হয়।
চারখাই, মুড়িয়া ও শেওলা ইউনিয়নে এসব অভিযানের তথ্য বিয়ানীবাজারে মাদকবিরোধী তৎপরতার একটি চিত্র তুলে ধরে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে পুরো উপজেলার মাদক পরিস্থিতি কিংবা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার অপরাধের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
চারখাই কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
চারখাই পূর্ব সিলেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগস্থল। জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের সঙ্গে সিলেটমুখী সড়ক যোগাযোগের কারণে এলাকাটি যানবাহন চলাচলের ব্যস্ত কেন্দ্র। এই এলাকায় একাধিক ইয়াবার চালান আটকের ঘটনায় সড়কপথে মাদক পরিবহন প্রতিরোধে পুলিশের চেকপোস্ট ও তল্লাশির গুরুত্ব সামনে এসেছে।
এর আগেও চারখাইয়ে বড় চালান আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। একটি স্থানীয় সংবাদপ্রতিবেদনে ১৯ আগস্ট থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারখাই এলাকায় আটটি অভিযানে ৩৪ হাজার ৩০০-এর বেশি ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হয়েছিল। অন্য একটি প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পৃথক অভিযানে কয়েক হাজার ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য উঠে আসে।
এসব তথ্য চারখাইকে ঘিরে মাদক পরিবহনের অভিযোগ আরও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে ইয়াবা উদ্ধারের সংখ্যা দিয়ে একাই প্রমাণ করা যায় না যে এলাকাটি মাদকের প্রধান প্রবেশপথ। মাদক কোথা থেকে আসছে, কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে এবং কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।
মাদকবিরোধী অভিযানে চালান উদ্ধার ও সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে পাচার প্রতিরোধের জন্য সরবরাহব্যবস্থার গভীরে পৌঁছানো প্রয়োজন। জব্দ করা চালানের উৎস, পরিবহনকারীদের সঙ্গে সরবরাহকারীদের সম্পর্ক, অর্থের জোগানদাতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তদন্তের অগ্রগতি জানা জরুরি।
বিশেষ করে পৃথক ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা সাংগঠনিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ। প্রমাণ ছাড়া তাঁদের একই চক্রের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
স্থানীয় নিরাপত্তা ও তরুণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
মাদক পাচার প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি, সড়কপথে সন্দেহজনক চালান শনাক্ত, মাদক বিক্রির অভিযোগ তদন্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
চারখাইয়ে ধারাবাহিক ইয়াবা উদ্ধারের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে: এসব চালানের উৎস কোথায়? এগুলোর গন্তব্য কি সিলেটের ভেতরে, নাকি অন্য কোনো জেলা? পৃথক ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে বৃহত্তর কোনো সরবরাহ নেটওয়ার্কের যোগসূত্র রয়েছে কি? আর নিয়মিত চেকপোস্ট ও অভিযানের ফলে মাদক পরিবহন কমছে কি না, তা কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত, জব্দের নথি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হালনাগাদ বক্তব্যের ভিত্তিতে সামনে আনা প্রয়োজন।
চারখাইয়ে একের পর এক ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা মাদক পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এখন প্রয়োজন শুধু চালান আটকানো নয়, বরং মাদকের উৎস, গন্তব্য ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রমাণভিত্তিক তথ্য সামনে আনা।




