Eng
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

চাহিদা ১৮ মেগাওয়াটের বেশি, সরবরাহ মাত্র ৭.১ মেগাওয়াট—আর এই ঘাটতির বোঝা বইছেন বিয়ানীবাজারের প্রায় ৬৬ হাজার গ্রাহক

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৭:১৯ অপরাহ্ণ



পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক, বিয়ানীবাজার (সিলেট):

চাহিদা ১৮ মেগাওয়াটের বেশি, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে কোনো কোনো সময়ে মাত্র ৭ দশমিক ১ মেগাওয়াট। প্রায় ৬৬ হাজার গ্রাহকের বিয়ানীবাজারে এ ঘাটতির খেসারত দিতে হচ্ছে দীর্ঘ লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজে। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। 

গ্রাহকদের অভিযোগ, দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে আবার চলে যায়। পৌরশহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিভ্রাটের মাত্রা বেশি। কোনো কোনো এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১৫ ঘণ্টারও বেশি বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

চাহিদা-সরবরাহে বড় ব্যবধান

বিয়ানীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ৬৬ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। পাঁচটি সাবস্টেশনের মাধ্যমে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

পল্লীবিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের হিসাবে, উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ মেগাওয়াটের বেশি। গত রোববার দুপুর ১২টায় চাহিদা ছিল ১৫ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৭ দশমিক ১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট।

বিয়ানীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ জোনাল অফিসের উপব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পার্থ চক্রবর্তী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্রিড থেকে সরবরাহ না বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি করা কঠিন।

গ্রামাঞ্চলে বেশি বিভ্রাট

স্থানীয়দের ভাষ্য, পৌরশহরে প্রতিদিন গড়ে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা এবং মফস্বল এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

কুড়ারবাজার, মাথিউরা ও তিলপাড়া ইউনিয়নের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এসব এলাকার একাংশ গোলাপগঞ্জের সুনামপুর সাবস্টেশন থেকে বিদ্যুৎ পায়। সেখানে কোনো কোনো দিন ১৫ ঘণ্টারও বেশি বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তিলপাড়া ও মাথিউরা ইউনিয়নের কয়েকজন গ্রাহক জানান, বিদ্যুৎ আসার পরও অনেক সময় ভোল্টেজ স্বাভাবিক থাকে না। এতে ফ্যান, ফ্রিজ, আইপিএসসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাতে সমস্যা হচ্ছে। কয়েকজন গ্রাহক যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার অভিযোগও করেছেন।

গ্রাহকের ক্ষোভ

তিলপাড়া ইউনিয়নের এক গ্রাহক বলেন, ‘‘দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে। এক ঘণ্টা না যেতেই আবার চলে যায়। বিদ্যুৎ থাকলেও অনেক সময় ভোল্টেজ কম থাকে।’’

মাথিউরা ইউনিয়নের এক বাসিন্দার ভাষ্য, রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের সময়সূচি অনেক ক্ষেত্রে ঠিক থাকছে না। ফলে পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।

লো ভোল্টেজের কারণ কী?

জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ ঘাটতিকে লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ বলছে পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। তবে লো ভোল্টেজ ও দীর্ঘ বিভ্রাটের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

ফিডারের ওপর অতিরিক্ত চাপ, ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা, সঞ্চালন লাইনের অবস্থা কিংবা স্থানীয় কারিগরি ত্রুটি—কোনটি কতটা প্রভাব ফেলছে, তা জানতে সাবস্টেশন ও ফিডারভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

প্রশ্ন এখন সমাধান নিয়ে

বিয়ানীবাজারের বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে—কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে তা স্পষ্ট। কিন্তু গ্রাহকদের দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি কমাতে স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলোও চিহ্নিত করা জরুরি।

চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধান কতদিন থাকবে, আর স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—প্রায় ৬৬ হাজার গ্রাহকের এখন মূল প্রশ্ন সেটিই।