
মানুষের জ্ঞানের গভীরতা সব সময় তার কথার পরিমাণ দিয়ে বোঝা যায় না। বরং অনেক সময় উল্টো চিত্রই দেখা যায়—যার জানার পরিধি সীমিত, তার বক্তব্যের পরিধি যেন সীমাহীন। বিষয়টি যত কম বোঝে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলার তাড়নাটা তত বেশি। আর তখনই তৈরি হয় এক অদ্ভুত দৃশ্য—গভীরতা কম, কিন্তু ঢেউয়ের শব্দ অনেক বেশি।
অল্প জানা কোনো অপরাধ নয়। কেউ সব বিষয়ে জানবে—এমন প্রত্যাশাও অযৌক্তিক। চিকিৎসক চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ হতে পারেন, কিন্তু তিনি আইন বা প্রকৌশলের সবকিছু জানবেন না। একজন আইনজীবী আইনের জটিল বিষয় বোঝেন, কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নাও হতে পারেন। জ্ঞানী মানুষ এই সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেন। অর্ধজ্ঞানী মানুষ বরং সীমারেখাটাকেই অস্বীকার করতে চান।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন না জানাকে স্বীকার করার বদলে না জানার ওপরই পাণ্ডিত্যের প্রলেপ দেওয়া হয়। একটি বিষয় ভালোভাবে না বুঝেই মন্তব্য, বিশ্লেষণ কিংবা সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রবণতা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও দৃশ্যমান। কয়েকটি তথ্য, দু-একটি শোনা কথা কিংবা একটি অসম্পূর্ণ ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলেন, যেন পুরো বিষয়টির ওপর তাঁরই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব।
কিন্তু কথা বলার আগে একটি প্রশ্ন করা জরুরি—আমি কি সত্যিই বিষয়টি জানি?
এই প্রশ্নটি মানুষকে ছোট করে না; বরং বড় করে। কারণ “আমি জানি না” বলতে পারা দুর্বলতার নয়, আত্মসচেতনতার পরিচয়। জানার আগ্রহ যেখানে আছে, সেখানে নীরবতাও এক ধরনের শিক্ষা। শোনা, যাচাই করা, প্রশ্ন করা এবং তারপর মত দেওয়া—এটাই জ্ঞানের স্বাভাবিক পথ।
দুঃখজনক হলো, কখনো কখনো এই অল্প জ্ঞান ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসকে অন্যরাও কাজে লাগায়। কেউ ইন্ধন দেয়, কেউ উৎসাহের নামে ভুল ধারণাকে আরও শক্ত করে, কেউ আবার নিজের স্বার্থে একজন মানুষকে সামনে রেখে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করে। ফলে যার মুখে কথা, সে হয়তো মনে করে নিজের বক্তব্যেই সবাইকে চমকে দিচ্ছে; অথচ আড়ালে অন্য কেউ সেই বক্তব্যের সুবিধা নিচ্ছে।
তাই অন্যের ইশারায় কথা বলার আগে নিজের অবস্থানটাও বুঝতে হয়। যে সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী, সে ভুল ধরিয়ে দেয়; যে ব্যবহার করতে চায়, সে অনেক সময় ভুলকেই বাহবা দেয়।
জীবন এ জায়গায় পানির কাছ থেকে বড় শিক্ষা দেয়। পানি পাথরের সঙ্গে তর্ক করে না, সংঘর্ষে নিজের শক্তি অপচয়ও করে না। সামনে বাধা এলে পথ বদলায়, পাশ কাটায়, কখনো ধীরে, কখনো দ্রুত—কিন্তু থেমে থাকে না। তার শক্তি শব্দে নয়, প্রবাহে; প্রদর্শনে নয়, পৌঁছে যাওয়ায়।
মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। সব কথার জবাব দিতে হয় না, সব বিতর্কে নামতে হয় না, সব বাধাকে আঘাত করে সরাতেও হয় না। কোথাও যুক্তি প্রয়োজন, কোথাও প্রতিবাদ; আবার কোথাও নীরবে সরে গিয়ে নিজের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়াই প্রজ্ঞার পরিচয়।
কঠিন হওয়া সহজ, নমনীয় হওয়া কঠিন। অহংকার মানুষকে পাথরের মতো অনড় করে, প্রজ্ঞা তাকে পানির মতো চলমান রাখে। পাথর নিজের জায়গায় পড়ে থাকে; পানি পথ খুঁজে নেয়।
সমাজে আজ শব্দের অভাব নেই—মতামতের শব্দ, আত্মপ্রদর্শনের শব্দ, অর্ধজ্ঞানী বিশ্লেষণের শব্দ। কিন্তু শব্দ যত বেশি, গভীরতা তত বেশি—এমন নয়। সমুদ্রের গভীরতা তার ঢেউয়ের শব্দে নয়, তার অতল নীরবতায়।
তাই কথা বলার আগে জানা দরকার, আর জানার আগে শেখা দরকার। ভুল হলে সংশোধনের সাহস থাকতে হবে। কেউ যদি আমাদের অজ্ঞতাকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়, তবে সেই খেলায় অংশ নেওয়ার আগে থামতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় করে তার কণ্ঠের উচ্চতা নয়, তার জ্ঞানের গভীরতা, আচরণের সংযম এবং সত্যকে গ্রহণ করার সাহস।
যার গভীরতা কম, তার ঢেউয়ের শব্দ বেশি হয়।
আর যে সত্যিই গভীর—সে অনেক সময় নীরব থেকেও অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
লেখক—Π আতাউর রহমান | অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, পুস্তক লেখক ও সমাজচিন্তক




