পঞ্চখণ্ড আই অনলাইন ডেস্ক : দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তৃণমূল পর্যায় থেকে আধুনিক ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আওতায় দেশের ৫০৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৬ হাজারের বেশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাব প্রতিষ্ঠা এবং নতুন করে বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আটটি বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন, আধুনিক রোগনির্ণয় সরঞ্জাম সরবরাহ, জরুরি চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট নিরসনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কমাতে ৫০৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫১, ১০১, ১২০, ১৩২ ও ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি ৪৪৩টি উপজেলায় সমন্বিত বহুতল সেবাভবন এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন সুবিধা নির্মাণ করা হবে।
উন্নীত হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, করোনারি কেয়ার, ওয়ান-স্টপ জরুরি সেবা, মেডিসিন, সার্জারি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য, চক্ষু এবং নাক-কান-গলা বিভাগের সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যানসার স্ক্রিনিং, ফিজিওথেরাপি, স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসাসহ আধুনিক রোগনির্ণয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি স্বাস্থ্যসেবা হাব এবং ১ হাজার ৬৩১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ বা সৌরবিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যমান ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আরও এক লাখ কর্মী যুক্ত করে মোট সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৪০ হাজারে উন্নীত করা হবে। তাঁদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তত দুই মাসে একবার স্বাস্থ্য পরামর্শ, রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করা হবে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে জটিল রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শুধু মানুষের দোরগোড়ায় নয়, বরং তাদের ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই।’
স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট মোকাবিলায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আড়াই হাজার নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রসবকালীন সেবা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় দেশে নার্সের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। চিকিৎসক, নার্সের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর ঘাটতিও রয়েছে। এসব সংকট কাটিয়ে উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই নিয়োগ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী নির্ভরতা কমাতে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পাঁচটি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (আইএনএমএএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ রয়েছে। এ প্রকল্পে প্রস্তাবিত ব্যয় ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর এবং প্রথমবারের মতো পাঁচটি অত্যাধুনিক রোবোটিক সার্জারি মেশিন কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে রোগীদের নিজ নিজ বিভাগে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী শহরে যাতায়াতের ব্যয় ও ভোগান্তি কমবে।
উপজেলা পর্যায়ে রোগনির্ণয় সুবিধার ঘাটতি দূর করতে দেশব্যাপী চিকিৎসা সরঞ্জামের নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অকেজো যন্ত্রপাতি এবং এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনের সংকট চিহ্নিত হয়েছে।
এ সমস্যা সমাধানে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য শিগগিরই ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে সচল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন সরবরাহে, যাতে রোগীদের সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে যেতে না হয়।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে সাভারে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। আগামী ১ জানুয়ারি এটি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এখানে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও অর্থায়ন বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়বে, বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি কেনাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ জনবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সেবার মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোপরি, ঘোষিত মহাপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯