বিষ মানেই কোনো বোতলে রাখা প্রাণঘাতী পদার্থ নয়। মানুষের আচরণ, সম্পর্ক ও সামাজিক পরিবেশেও এমন কিছু বিষ থাকে, যার কোনো রং-গন্ধ নেই, কিন্তু প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। একটি অবজ্ঞার বাক্য আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে, বিশ্বাসঘাতকতা মানুষের আস্থাকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে, আর স্বার্থের সম্পর্ক মানুষকে একসময় ব্যক্তি নয়, কেবল প্রয়োজন হিসেবে দেখতে শেখায়।
এই অদৃশ্য বিষের সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো অনেক সময় আঘাতের চেহারায় আসে না। হিংসা হাসিমুখে প্রকাশ পায়, প্রতারণা বন্ধুত্বের আবরণে এগিয়ে আসে, অবহেলা নীরবতার মধ্য দিয়ে ঘটে। ফলে ক্ষত তৈরি হওয়ার আগে আক্রান্ত মানুষ অনেক সময় বিপদের উৎস বুঝতেই পারেন না।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই বাস্তবতা এখন বৃহত্তর সামাজিক জীবনেরও প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজে মতের অমিল ক্রমেই ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সম্পর্ক নষ্ট করছে, প্রতিযোগিতা সহযোগিতাকে গ্রাস করছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের পরিবর্তে অপমান, বিদ্বেষ ও চরিত্রহননের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
রাজনীতিতে এর অভিঘাত আরও গভীর। প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী না দেখে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা, ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করা এবং গুজবকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। মতের সংঘাত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু ভিন্নমতের মানুষের প্রতি ঘৃণা গণতন্ত্রের শক্তি নয়, দুর্বলতা।
একটি সুস্থ সমাজে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু পারস্পরিক মর্যাদাবোধও থাকতে হবে। কারণ মানুষ যখন যুক্তির পরিবর্তে অপমানকে বেছে নেয়, তখন বিতর্কের জায়গা দখল করে বিদ্বেষ। আর বিদ্বেষ দীর্ঘদিন জমতে থাকলে সামাজিক সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে যায়।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও আস্থার সংকট এক ধরনের অদৃশ্য বিষ। নাগরিক যদি মনে করেন তার কথা শোনা হবে না, ন্যায়বিচার পেতে তাকে অসীম প্রতীক্ষা করতে হবে, যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিংবা সত্য উচ্চারণের মূল্য দিতে হবে—তাহলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। আস্থা একবার ক্ষয়ে গেলে তা পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগে।
সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতা, যা সে বিশ্বাসের জায়গা থেকে প্রকাশ করেছিল, পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হয়। বন্ধুর কাছে বলা কথা, পরিবারের কাছে প্রকাশ করা কষ্ট কিংবা সহকর্মীর কাছে স্বীকার করা সীমাবদ্ধতা—এসবই এক ধরনের আমানত। সেই আমানতকে অপমান বা স্বার্থসিদ্ধির অস্ত্র বানানো শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়; এটি পারস্পরিক আস্থার ওপরও আঘাত।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—কাছের মানুষ হওয়া কি শুধু কাছে থাকার নাম, নাকি নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার নাম?
স্বার্থের সম্পর্ক মানুষকে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ করে। যতদিন প্রয়োজন থাকে, ততদিন যোগাযোগ; প্রয়োজন শেষ হলে সম্পর্কের উষ্ণতাও ফুরিয়ে যায়। এমন সংস্কৃতিতে মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষকে ভালোবাসার বদলে মূল্যায়ন করতে শেখে—‘তার কাছ থেকে আমি কী পাব?’ এই মানসিকতা ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু সমাজকে করে তোলে অবিশ্বাসী।
মানবসভ্যতার বিকাশ অবশ্য ভিন্ন বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পরিবার, বন্ধুত্ব, প্রতিবেশ, প্রতিষ্ঠান—সবকিছুর ভিত্তিতে রয়েছে সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থা। তাই আস্থার অবক্ষয় কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক পুঁজিরও ক্ষয়।
তবে এর প্রতিকার কাউকে সন্দেহ করা নয়। প্রয়োজন বিশ্বাসের সঙ্গে বিবেচনাবোধের সমন্বয়। সরলতা মূল্যবান, কিন্তু অন্ধ সরলতা নয়। ক্ষমা মহৎ, কিন্তু পুনঃপুন অন্যায়ের সুযোগ করে দেওয়া প্রজ্ঞা নয়। ভালোবাসা প্রয়োজন, কিন্তু আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নয়।
মানুষের চরিত্র বোঝার জন্য তার কথার চেয়ে আচরণের ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে আপনার অনুপস্থিতিতে অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, দুর্বল মানুষের প্রতি তার ব্যবহার কেমন, আপনার সাফল্যে সে আনন্দিত হয় নাকি অস্বস্তি বোধ করে, আপনার বিপদে পাশে দাঁড়ায় নাকি সুযোগ নেয়—এসব প্রশ্নের উত্তরেই অনেক সময় প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়।
সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনেও একই নীতি প্রযোজ্য। যে রাজনীতি বিভাজনকে পুঁজি করে, যে নেতৃত্ব ভয়কে হাতিয়ার বানায়, যে প্রতিষ্ঠান জবাবদিহি এড়িয়ে চলে এবং যে জনপরিসর সত্যের বদলে উত্তেজনাকে পুরস্কৃত করে—তাদের সম্মিলিত প্রভাব সমাজকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে।
এই বিষ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত সচেতনতা। এরপর প্রয়োজন নৈতিকতা ও জবাবদিহি। ব্যক্তিজীবনে প্রয়োজন সুস্থ সীমারেখা; সামাজিক জীবনে অন্যায়ের প্রতিবাদ; রাজনৈতিক পরিসরে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা; আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা।
তবে প্রতিটি আঘাতের উত্তর প্রতিশোধ হতে পারে না। কখনো দূরত্বই আত্মরক্ষার উপায়, কখনো নীরবতা মর্যাদা রক্ষা করে, কখনো সত্য প্রকাশ করাই প্রয়োজনীয় প্রতিবাদ। অন্যের বিদ্বেষ নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখা কোনো সমাধান নয়। যে মানুষ অন্যের বিষ নিজের চরিত্রে ধারণ করে, সে শেষ পর্যন্ত সেই বিষেরই বাহক হয়ে ওঠে।
তাই মানুষকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু মানুষ চিনতেও হবে। বিশ্বাস করতে হবে, তবে বিবেচনাবোধ বিসর্জন দিয়ে নয়। ক্ষমা করতে হবে, কিন্তু অন্যায়কে স্বাভাবিক করে নয়।
বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে নিজেকে রক্ষা করা ব্যক্তিগত প্রজ্ঞার বিষয়; কিন্তু বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশ থেকে সমাজকে রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে হিংসা বুদ্ধিমত্তা হিসেবে, অপমান শক্তি হিসেবে, প্রতারণা কৌশল হিসেবে এবং বিশ্বাসঘাতকতা সাফল্যের উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা না পায়।
দৃশ্যমান বিষের বিপদ আমরা সহজেই বুঝি। অদৃশ্য বিষের বিপদ বোঝা কঠিন—কারণ তার ক্ষত অনেক সময় শরীরে নয়, মানুষের বিশ্বাসে তৈরি হয়।
সেই কারণে সতর্কতা শুধু বোতলের গায়ে লেখা সতর্কবাণীর জন্য নয়; মানুষের আচরণ পড়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন।
সব বিষ বোতলে থাকে না। কিছু বিষ মানুষের কথায়, সম্পর্কে ও ব্যবহারে মিশে থাকে। আর সেই বিষ থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক হলো—সচেতনতা, আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা ও প্রজ্ঞা।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯