রাজনীতিতে ‘ত্যাগ’ একটি মহৎ শব্দ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আদর্শ, সাহস, আত্মনিবেদন ও জনস্বার্থে ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জনের ইতিহাস। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘ত্যাগী’ পরিচয়ের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কে প্রকৃত ত্যাগী, কে সুবিধাভোগী, আর কে ত্যাগের অভিনয়ে নিজের অতীত আড়াল করতে ব্যস্ত—তা নির্ধারণে প্রয়োজন আবেগ নয়, নির্মোহ মূল্যায়ন।
প্রকৃত ত্যাগী তিনি, যিনি প্রতিকূল সময়ে আদর্শের প্রশ্নে আপস করেননি; বিপদ, নির্যাতন ও ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি নিয়েও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ক্ষমতার সুদিনে ব্যক্তিস্বার্থের হিসাব না করে দুঃসময়ে সংগঠন, সহকর্মী ও মানুষের পাশে থেকেছেন। তাঁর পরিচয় আত্মপ্রচারে নয়, কর্মে ও ধারাবাহিকতায়।
অন্যদিকে, সুবিধাবাদীরা রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদলে ত্যাগের সনদ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের কাছে ত্যাগ যেন আদর্শিক অর্জন নয়, বরং পদ-পদবি, প্রভাব ও নেতৃত্বের দাবিতে ব্যবহারের রাজনৈতিক পুঁজি।
কারাবাসের ইতিহাস থাকলেই কাউকে ত্যাগী বলা যায় না। কেউ রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে কারাগারে যেতে পারেন, আবার কেউ অপরাধের দায়েও কারাবাস করতে পারেন। এ দুই বাস্তবতা এক নয়।
অতীতে চুরি, প্রতারণা কিংবা অন্য অপরাধে দণ্ডিত হয়ে কারাবাস করা কেউ রাজনীতিতে যুক্ত হলে তাঁর অতীত যাচাইয়ের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। তবে অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, তিনি অতীতের দায় স্বীকার করেছেন কি না, আচরণে পরিবর্তন এনেছেন কি না এবং জনসেবায় বিশ্বাসযোগ্য অবদান রেখেছেন কি না।
মানুষের সংশোধনের অধিকার আছে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অতীতের দায় মুছে ফেলার অধিকার নেই। অনুশোচনা ও সংশোধন এক বিষয়, আর অতীত আড়াল করে ত্যাগের মর্যাদা দাবি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ সময়ের আগে ও পরে অনেকের ভূমিকা, অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিচয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কারও অতীতকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহিমান্বিত করে না; আবার নতুন বাস্তবতায় সক্রিয় হওয়াও অপরাধের প্রমাণ নয়।
কে কখন কোথায় ছিলেন, কী ভূমিকা রেখেছেন, কতটা ঝুঁকি নিয়েছেন এবং জনস্বার্থে তাঁর অবদান কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেই ইতিহাস বদলে যায় না; প্রচারণা দিয়ে অতীতের প্রকৃত চিত্রও স্থায়ীভাবে আড়াল করা যায় না।
ত্যাগের চেয়ে ত্যাগের প্রচার যখন বেশি গুরুত্ব পায়, তখন নীরবে দায়িত্ব পালন করা কর্মীরা আড়ালে পড়ে যান। বছরের পর বছর সংগঠন ধরে রাখা, দুঃসময়ে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতি স্বীকার করেও জনস্বার্থে কাজ করা মানুষগুলো অর্থ, প্রভাব ও আত্মপ্রচারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
অথচ নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত সততা, যোগ্যতা, সাংগঠনিক অবদান, জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। মামলা, কারাবাস, মিছিল কিংবা আত্মপ্রচারের ইতিহাস একা কাউকে নেতৃত্বের যোগ্য প্রমাণ করে না।
এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে যোগ্য কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়বে, সংগঠনের অভ্যন্তরে আস্থার সংকট তৈরি হবে এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রকৃত ত্যাগীদের সামনে এগিয়ে নিতে ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা আবেগনির্ভর প্রশংসার পরিবর্তে প্রয়োজন নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। রাজনৈতিক জীবনের ধারাবাহিকতা, প্রতিকূল সময়ে ভূমিকা, জনস্বার্থে অবদান এবং নৈতিক আচরণ হতে হবে স্বীকৃতির ভিত্তি। একইভাবে, অতীতের অভিযোগ ও অপরাধের বিষয়টি যাচাই করতে হবে প্রমাণ, আইনি অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যের আলোকে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করা যেমন অনুচিত, তেমনি দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ত্যাগীদের প্রাপ্য সম্মান দিতে হলে আত্মপ্রচারনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে যোগ্যতা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনীতিতে ত্যাগী হওয়ার দাবি করা সহজ, কিন্তু ত্যাগের মর্যাদা অর্জন কঠিন। কেউ নিজের ত্যাগের কথা যতবারই বলুন, সেই দাবির সত্যতা নির্ধারিত হবে তাঁর কর্ম, ইতিহাস ও জনস্বার্থে অবদানের মাধ্যমে।
ত্যাগের মুখোশ পরে নেতৃত্ব দখলের প্রবণতা বন্ধ হোক। প্রকৃত ত্যাগীরা যেন প্রচারের ভিড়ে হারিয়ে না যান, আর অতীতের দায় আড়াল করে কেউ যেন ত্যাগের কৃতিত্ব আদায় করতে না পারেন।
মনে রাখতে হবে, রাজনীতিতে পরিচয়ের লেবেল নয়, চরিত্রের প্রমাণই গুরুত্বপূর্ণ। ত্যাগের অভিনয়ে সাময়িক বাহবা পাওয়া যায়; কিন্তু প্রকৃত ত্যাগীর মর্যাদা অর্জন করতে হয় আদর্শ, সততা ও কর্মের মধ্য দিয়ে।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯