একটি গ্রামের প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যা, সম্পদ কিংবা অবকাঠামোয় নয়—মানুষের ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সম্প্রীতিতে। যে গ্রামে মানুষ বিপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়, মতপার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখে এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে সমষ্টির কল্যাণকে স্থান দেয়, সেই গ্রামই প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ। কিন্তু নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, পদ-পদবির প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিগত অসন্তোষ যখন সামাজিক দায়িত্ববোধকে ছাপিয়ে যায়, তখন ঐক্যে ফাটল ধরে। কানকথা, পরনিন্দা, সন্দেহ ও পারস্পরিক দোষারোপ মানুষের আস্থা নষ্ট করে; ব্যাহত হয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম, থমকে যায় উন্নয়নের গতি। প্রশ্ন হলো—ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে একটি গ্রামের শান্তি, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে? গ্রাম কারও একার নয়; তাই গ্রামের শান্তি ও সম্মান রক্ষার দায়িত্বও সবার।
কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণ না হলে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই হতাশা থেকে অযথা বিতর্ক, পরনিন্দা কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্ক নষ্ট হয়, তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। একই রাস্তা, বাজার ও সামাজিক পরিসরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পরিবার থেকে পরিবারে, পাড়া থেকে পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজে এমন কিছু আচরণ দেখা যায়, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ সামাজিক দায়িত্ববোধকে ছাপিয়ে যায়। কাল্পনিক তুরাক, মিল্কি, জুলা ও মূলা—এই চারটি নামকে সমাজের কিছু নেতিবাচক প্রবণতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এগুলো কোনো ব্যক্তির স্থায়ী পরিচয় নয়; বরং সংশোধনযোগ্য আচরণের প্রতীক। আত্মসমালোচনা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এসব নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তাই ব্যক্তিকে আক্রমণ নয়, ক্ষতিকর আচরণের সংশোধনই হোক আমাদের লক্ষ্য।
সামাজিক অস্থিরতার কারণে মাদক, কিশোর-তরুণদের বিপথগামিতা, শিক্ষার ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা আড়ালে পড়ে যেতে পারে। যে শক্তি ব্যয় হওয়ার কথা মাদক প্রতিরোধ, তরুণদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠন এবং গ্রামের উন্নয়নে, তা যদি পারস্পরিক বিরোধে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জনপদ।
মাদকের বিস্তার রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রবীণ সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মাদক কেনাবেচা কিংবা জনশান্তি বিঘ্নিত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে গুজব, অপপ্রচার ও যাচাইহীন অভিযোগ থেকে বিরত থাকতে হবে।
মতপার্থক্য অপরাধ নয়; বরং মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করাই উদ্বেগের বিষয়। সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, অভিযোগ উত্থাপিত হতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়ায়, আর নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা পরিচালিত হওয়া উচিত যোগ্যতা, সততা ও জনসেবার ভিত্তিতে।
গ্রামের সামাজিক প্রতিষ্ঠান কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নেতৃত্বের দায়িত্ব যেমন জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত, তেমনি দায়িত্ব না পেলেও সমাজের প্রতি প্রত্যেকের কর্তব্য থেকে যায়। পদ সাময়িক, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, ভালো কাজের স্মৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী।
তাই গ্রামের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় কানকথার বদলে সত্য যাচাই, বিরোধের বদলে সংলাপ এবং ব্যক্তিস্বার্থের বদলে জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে হবে এবং তরুণদের শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও গঠনমূলক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে হবে।
এখনই সময় ব্যক্তিগত বিরোধ ও পারস্পরিক দোষারোপের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রামের বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। প্রবীণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রতিটি গ্রামের নাগরিকদের অঙ্গীকার করতে হবে—ব্যক্তিস্বার্থে সামাজিক ঐক্য নষ্ট করব না, গুজব ছড়াব না, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করব না। সত্য যাচাই করে কথা বলব, আইনসম্মত পথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করব এবং গ্রামের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করব।
গ্রাম বদলানোর দায়িত্ব শুধু নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের নয়; এ দায়িত্ব আমাদের সবার। প্রতিটি পরিবার সচেতন হলে, প্রতিটি পাড়া দায়িত্ব নিলে এবং প্রতিটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করলে একটি নিরাপদ, মাদকমুক্ত ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
বিভেদের দেয়াল নয়—ঐক্যের সেতু গড়ে তুলুন; ব্যক্তিস্বার্থ নয়—জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিন। কারণ, গ্রামের প্রকৃত শক্তি কোনো একক ব্যক্তি নয়; গ্রামের মানুষের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সামাজিক ঐক্য।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯