আতাউর রহমান | পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক:
বিয়ানীবাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সেবাগ্রহীতা, দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল থেকে নানা অভিযোগের কথা উঠে আসছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি নিয়ে প্রশ্ন, দলিল নিবন্ধনে বিলম্ব, নির্দিষ্ট দলিল লেখক বা মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং অসুস্থ ব্যক্তির কমিশন দলিল নিবন্ধন—এসব অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি একটি হেবা দলিল নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জনসমক্ষে তুলে ধরতে পঞ্চখণ্ড আই ধারাবাহিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।
সরাসরি সাক্ষাৎকারে সাব-রেজিস্ট্রার
৫ অক্টোবর ২০২৬ বিয়ানীবাজার সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কক্ষে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে সাব-রেজিস্ট্রার মো. জয়নাল আবেদিনের সরাসরি সাক্ষাৎকার হয়। তাঁকে অফিসের কার্যক্রম ও তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো একে একে জানিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। জমির প্রকৃত শ্রেণির পরিবর্তে অন্য শ্রেণি দেখিয়ে সরকারি রাজস্ব কমানোর অভিযোগ, নির্দিষ্ট দলিল লেখক বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দলিল না করলে কাজ কঠিন হওয়ার অভিযোগ এবং ফাইলের ত্রুটি বা আইনি জটিলতার অজুহাতে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের অভিযোগ সম্পর্কেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়।
অসুস্থ বা অচল ব্যক্তির কমিশন দলিলের ক্ষেত্রে সরকারি খরচের বাইরে অতিরিক্ত ৪০–৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তাঁর কাছে সরাসরি উপস্থাপন করা হয়। এসব অভিযোগের বিষয়েও তিনি তাঁর বক্তব্য দেন।
দলিল লেখকদের নিয়ে অভিযোগ
দলিল লেখকদের লাইসেন্স বাতিল বা অফিসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখানোর অভিযোগও সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়। ভুল বোঝাবুঝি হলে তা সমাধান করা হয় এবং তিনি কারও প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ করেননি।
অফিসে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি জানান, বিয়ানীবাজারে তিন দিন এবং জকিগঞ্জে দুই দিন কাজ করেন। ছুটির বিষয়টি আলাদা বলেও উল্লেখ করেন।
অডিট হয়েছে দুইবার—সাব-রেজিস্ট্রারের দাবি
২০২২ সালের ২০ জুলাই বিয়ানীবাজারে যোগদানের পর তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে কোনো তদন্ত বা অডিট হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে সাব-রেজিস্ট্রার জানান, দুইবার অডিট হয়েছে এবং তাঁর জানা মতে কোনো অভিযোগ বা আপত্তি নেই।
তবে অডিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বা নথি পঞ্চখণ্ড আই-এর হাতে এখনও আসেনি। ফলে অডিটের প্রকৃতি, সময়কাল, পর্যবেক্ষণ এবং কোনো আপত্তি বা সুপারিশ ছিল কি না—তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অসুস্থ ব্যক্তির হেবা দলিল: দুইবার বাড়িতে গিয়েছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার
১ অক্টোবর ২০২৬ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টে অসুস্থ এক ব্যক্তির হেবা দলিল নিবন্ধন না করার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়, দলিলটি নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের পক্ষ থেকে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অনুরোধ করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার জানান, তিনি ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর দুইবার কমিশনার হিসেবে অসুস্থ ব্যক্তির বাড়িতে যান। অসুস্থ ব্যক্তির ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা হয় বলে জানান তিনি।
দলিলটি নিবন্ধন না করার কারণ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য—অসুস্থ ব্যক্তি কথা বলতে পারেননি এবং কোনো ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমেও সম্মতিসূচক কিছু ব্যক্ত করতে পারেননি। তাঁর কাছে মৌখিক স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বলেও তিনি জানান।
আইনেও নিবন্ধন কর্মকর্তাকে দলিল সম্পাদনকারী ব্যক্তির পরিচয় ও দলিলটি তাঁর দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসায় গিয়ে দলিল গ্রহণের সুযোগও আইনে রয়েছে।
অন্যদিকে তাঁকে হেবা দলিল নিবন্ধনের জন্য চাপ দেওয়া এবং পরবর্তীতে ফেসবুকে হুমকি দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা তিনি “ডাহা মিথ্যে” বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট সুপারিশকারী ব্যক্তি (এডভোকেট) তাঁকে মুঠোফোনে বারবার দলিল নিবন্ধনের জন্য চাপ দিয়েছিলেন।
বৈঠক হয়েছিল দলিল লেখকদের সঙ্গে?
হেবা দলিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলিল লেখকদের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নের জবাবে সাব-রেজিস্ট্রার জানান, ওই দিন ডেঙ্গু সংক্রান্ত সচেতনতা, অফিসের আইপিএস সংস্কার এবং দলিল লেখক মামুনুর রশিদ খান-সংক্রান্ত ৩টি বিষয়ে দলিল লেখকদের সঙ্গে আলোচনা হয়।
তিনি জানান, ওই সভায় সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক নাঈম উদ্দিন খানকে অসুস্থ ব্যক্তির হেবা দলিলের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ সময় দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আবু আহমদ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিকসহ অন্যরাও উপস্থিত ছিলেন বলে তাঁর দাবি।
পুরোনো সম্পত্তি-আপত্তির নথি
এরই মধ্যে পঞ্চখণ্ড আই-এর হাতে এসেছে একটি লিখিত আপত্তিপত্র, যার তারিখ ৭ অক্টোবর ২০২৪। এতে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন মালিকপক্ষ বিয়ানীবাজার সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে একটি সম্পত্তি অবৈধভাবে হস্তান্তর বা নিবন্ধনের আশঙ্কায় আপত্তি জানান।
আপত্তিপত্রে দাগ নম্বর ১৭২১, খতিয়ান ৫০৭, জেএল ১০৬, ফতেহপুর-দাশগ্রাম মৌজার সম্পত্তির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং অসুস্থ পিতার নামে থাকা সম্পত্তি অন্যদের মাধ্যমে হস্তান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে। আপত্তিকারীরা দলিল নিবন্ধনের আগে মালিকপক্ষের উপস্থিতি ও সম্মতি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট দলিলদাতার দুই স্ত্রী, তিন পুত্র ও তিন কন্যা রয়েছেন। উল্লেখিত সম্পত্তি এক কন্যার নামে লিখে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে অপর অংশীজন আপত্তি জানান বলে তাঁর বক্তব্য।
আপত্তিকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের পিতার বয়স তখন ৯৩ বছরেরও বেশি। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ, অক্ষম এবং হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। তাঁদের দাবি, ওই অবস্থায় তিনি স্বাধীন ও স্বাভাবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায় ছিলেন না।
লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের চিঠি
এ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে ১৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর (উপসচিব) দেওয়ান মাহমুদুল হক স্বাক্ষরিত একটি চিঠির তথ্যও পঞ্চখণ্ড আই-এর হাতে এসেছে। চিঠিতে জমি অবৈধভাবে হস্তান্তর ও নিবন্ধনের প্রচেষ্টার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক, সিলেট বরাবর বিষয়টি প্রেরণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে আরও দাবি করা হয়, এর আগে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নতুনভাবে দলিল প্রস্তুতের আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে এ পুরোনো সম্পত্তি-আপত্তির সঙ্গে ২০২৬ সালের হেবা দলিলের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কোন পর্যায়ে কারা যোগাযোগ করেছেন, কী কী দলিল প্রস্তুত হয়েছিল এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথিতে এর কী প্রতিফলন রয়েছে—এসব বিষয়ই এখন অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সামনে আরও যে প্রশ্ন
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কেবল একটি হেবা দলিলকে ঘিরে নয়। সরকারি ফি’র বাইরে অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি নির্ধারণ, দলিল লেখক ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা, কমিশন দলিল, দলিল সম্পাদনে বিলম্ব, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি এবং অভিযোগের লিখিত নিষ্পত্তি—প্রতিটি বিষয়েই নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
পঞ্চখণ্ড আই-এর অনুসন্ধানের লক্ষ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য, সরকারি নথি, দলিল, ফি-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাশাপাশি রেখে প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরাই এ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য।
এ ধারাবাহিকতায় পঞ্চখণ্ড আই-এর অনুসন্ধানে পরবর্তী পর্বে দেখা হবে—দলিল নিবন্ধনে সরকারি ফি কত, কোন খাতে কত অর্থ নেওয়ার বিধান রয়েছে এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাইয়ের উপায় কী।” (চলবে)
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯