৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি জাতীয়ভাবে পালিত হবে। শিক্ষক সমাজের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে দিবসটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষকদের মর্যাদা, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারে পরিণত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মূলত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা—এই তিন স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত। পাশাপাশি সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন ধারাও রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ধরন ও স্তরে পার্থক্য থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে যাঁরা পাঠদান করেন, তাঁরা সবাই শিক্ষক এবং সমাজের অত্যন্ত সম্মানিত একটি পেশার সঙ্গে যুক্ত।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার সুযোগ, ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুবিধার ক্ষেত্রে এখনো নানা বৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা।
একইভাবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এ বৈষম্যের প্রভাব রয়েছে। সরকারি স্কুল-কলেজের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বেতন, সেশন ফি ও অন্যান্য ব্যয় বেশি। আবার সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ জেলা ও উপজেলা সদরে অবস্থিত হওয়ায় প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়ে। ফলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়টি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবন ও কর্মজীবনের প্রস্তুতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই পর্যায় শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় না গিয়ে জীবিকা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়। তাই তাদের শুধু প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিলেই হবে না; নাগরিক অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য, নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, কারিগরি দক্ষতা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যবহারিক ও যুগোপযোগী জ্ঞান প্রদান করতে হবে।
শিক্ষা দিবসের ডাক হোক বৈষম্যহীন শিক্ষার
এ বাস্তবতায় বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অন্যতম অঙ্গীকার হতে পারে—প্রাথমিক থেকে অন্তত উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে আরও কার্যকরভাবে গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষার অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর শিক্ষার সুযোগ অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সমাজে শিক্ষাগত ও সামাজিক বৈষম্য বাড়তে পারে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তারা সহজেই অতিরিক্ত সুযোগ গ্রহণ করতে পারে; বিপরীতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের মেধাবী সন্তানরা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন শক্তিশালী করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মেধাবী ও যোগ্য তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে সম্মানজনক বেতন, পেশাগত মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে সেই জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অগ্রগতির পেছনে মানসম্মত, সবার জন্য সহজলভ্য ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর মনিটরিং
শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে শুধু সরকারি অর্থায়ন বা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা।
প্রয়োজনীয় সংখ্যক মনিটরিং কর্মকর্তা নিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষকদের উপস্থিতি ও শ্রেণি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, কার্যকর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআর ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কাগজপত্রের চাপ কমাতে হবে। একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধানের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পাঠদান ও শিক্ষার মান তদারক করা। অফিসিয়াল ও তথ্য-সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করা হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা শ্রেণি কার্যক্রমে আরও কার্যকরভাবে মনোযোগ দিতে পারবেন।
অপ্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া, বারবার জেলা বা উপজেলা অফিসে গিয়ে প্রশাসনিক কাজে সময় ব্যয় করা এবং অতিরিক্ত দাপ্তরিক চাপ কমিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নিজ প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ তৈরি করাও শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার হোক বাস্তবায়নের
বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি শিক্ষক সমাজের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন।
শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদেরও আন্তরিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের নীতিগত উদ্যোগ এবং শিক্ষকদের পেশাগত নিষ্ঠা—দুটির সমন্বয়েই একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
তাই ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ডাক হোক—শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষায় বৈষম্য কমানো, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করার বাস্তব অঙ্গীকার।
দিবসটি যেন কেবল কাগজে-কলমে কিংবা সুন্দর সুন্দর বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং অনাগত প্রজন্মের জন্য একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপের সূচনা করে—এটাই হোক বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি -Π আব্দুদ দাইয়ান: সাবেক প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি, বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখা, সিলেট।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯