বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ হিরণ মাহমুদ জানান, উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে মোট ২৮৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং একই সংখ্যক পরিবারকে এসব ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা, খালি ঘর ও জরাজীর্ণ ঘরের পৃথক কোনো পরিসংখ্যান তাঁর দপ্তরে নেই।
সরকারি নথিতে বরাদ্দের হিসাব থাকলেও মাঠপর্যায়ের বর্তমান চিত্রের এই ঘাটতিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ ঘর নির্মাণ ও বরাদ্দের পর প্রকৃত পুনর্বাসনের চিত্র নির্ভর করে পরিবারগুলো সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে কি না এবং ঘরগুলো বসবাসযোগ্য আছে কি না—তার ওপর।
উপজেলার তিনটি এলাকায় বাস্তবায়িত আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোর কয়েকটিতে সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরাদ্দ পাওয়া অনেক পরিবার প্রকল্প ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। কোথাও কয়েকটি পরিবার বসবাস করলেও বেশ কিছু ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। কোনো কোনো ঘর আবার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে মুল্লাপুর ইউনিয়নের কাছাটুল এলাকায় নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে শুরু থেকেই উপকারভোগীদের বসবাসে অনীহার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, কর্মসংস্থানের সুযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা, পানি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে ঘর পাওয়ার পরও জীবিকার প্রয়োজনে অনেক পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
খাসা পণ্ডিতপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা পারভিন বেগম বলেন, “তিন বছর ধরে কষ্ট করে এখানে থাকি। আগে ৪০টি পরিবার ছিল, এখন ১০-১২টি পরিবার আছে। এখানে বসবাস করার মতো কোনো পরিবেশ নেই। ঘরের অবস্থা খুব খারাপ। বাইরে থেকে সুন্দর লাগলেও ভেতরে খারাপ অবস্থা। যে কারণে বাধ্য হয়ে অনেকে এখান থেকে চলে যাচ্ছে।”
একই প্রকল্পের আরেক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঘর দেওয়ার পর থেকে একদিনও কেউ খোঁজখবর রাখেনি। এক বছরের মধ্যে ঘরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে।”
বাসিন্দাদের বক্তব্যে ঘরের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং জীবিকার সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে একটি ঘর দেওয়া নয়; তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা না থাকলে একটি পরিবার সেখানে দীর্ঘদিন টিকে থাকা কঠিন।
বিয়ানীবাজারের কয়েকটি প্রকল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। কোথাও পানি ও যোগাযোগের সমস্যা রয়েছে। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের সুবিধাও পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘরের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ার বিষয়টি।
ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত ঘর থাকলেও সেগুলো অনেক পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসন হয়ে উঠতে পারেনি।
সম্প্রতি খাসা পণ্ডিতপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের এক বাসিন্দাকে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয়রা সেখান থেকে বের করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাটির আইনগত সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়। তবে এ ঘটনায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে উপকারভোগী নির্বাচন এবং বরাদ্দের পর বাসিন্দাদের কার্যক্রম ও সামাজিক পরিবেশ তদারকির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
সচেতন মহলের মতে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের কার্যকারিতা শুধু ঘর নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; যোগাযোগ, পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুবিধা ও সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, “বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের কিছু ঘর জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে একটি তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। যেসব ঘর সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বিয়ানীবাজারের আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরকারি হিসাবে ২৮৭টি ঘর এবং ২৮৭টি বরাদ্দপ্রাপ্ত পরিবার রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রকৃত বসবাসকারীর সংখ্যা, খালি ঘর ও জরাজীর্ণ ঘরের হালনাগাদ তথ্য না থাকায় পুনর্বাসনের বর্তমান চিত্র স্পষ্ট নয়।
অথচ আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাফল্য শুধু ঘর নির্মাণ বা বরাদ্দের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বরাদ্দ পাওয়া পরিবারগুলো সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারছে কি না, ঘরগুলো ব্যবহারযোগ্য আছে কি না এবং ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা মিলছে কি না—এসব বিষয়ও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তাই সরকারি অর্থে নির্মিত ২৮৭টি ঘরের বর্তমান ব্যবহার, বসবাসকারীর সংখ্যা ও ঘরগুলোর অবস্থা নিয়ে প্রকল্পভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯