ঘর বিক্রি করা যায়। জমি বিক্রি করা যায়। সোনা বিক্রি করা যায়। প্রয়োজনে জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে মানুষ আবার শুরু করতে পারে। কিন্তু একটি জিনিস বিক্রি হয়ে গেলে নতুন করে জীবন শুরু করা কঠিন—বিবেক।
আর স্বপ্ন?
স্বপ্ন হারিয়ে গেলে মানুষ বেঁচে থাকে ঠিকই, কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়ার কারণটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
আজকের সমাজের সংকট তাই শুধু অর্থনৈতিক নয়। এর আরও গভীরে রয়েছে একটি নৈতিক প্রশ্ন—আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজের দিকে যাচ্ছি, যেখানে স্বার্থের কাছে বিবেকেরও বাজারদর নির্ধারিত হয়?
দেউলিয়াত্ব বলতে আমরা সাধারণত অর্থের হিসাব বুঝি। আয় কমেছে, ঋণ বেড়েছে, সম্পদ শেষ হয়েছে—তাই দেউলিয়া। কিন্তু সমাজের একটি অদৃশ্য দেউলিয়াত্ব আছে, যার কোনো হিসাবরক্ষণ নেই। সেটি হলো নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
যেখানে সামান্য সুবিধার জন্য সত্য গোপন করা হয়, অন্যায় দেখে নীরব থাকা হয়, সম্পর্ককে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হয় এবং ক্ষমতার কাছে নীতি বিসর্জন দেওয়া হয়—সেখানেই এই দেউলিয়াত্বের সূচনা।
মানুষকে কিনতে সব সময় বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয় না। একটি পদ, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ, ব্যবসায়িক সুবিধা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ—কখনো এগুলোর যেকোনো একটিই যথেষ্ট।
বিবেক সাধারণত একদিনে বিক্রি হয় না। প্রথমে মানুষ একটি অন্যায় দেখে চুপ থাকে। তারপর একটি মিথ্যাকে সুবিধার জন্য সমর্থন করে। পরে নিজের স্বার্থে সত্যকে আড়াল করে। একসময় আপসটাই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক আচরণ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি তখনই আসে, যখন ব্যক্তি নিজের আপসকে আর আপস বলে মনে করেন না; বরং সেটিকে বুদ্ধিমত্তা, বাস্তবতা কিংবা সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন।
সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি বিশ্বাস। অথচ সুবিধাবাদী মানসিকতা যখন সম্পর্কের ভেতর ঢুকে পড়ে, তখন মানুষও হয়ে যায় এক ধরনের ‘সম্পদ’—যার মূল্য নির্ধারিত হয় সে কতটা কাজে আসতে পারে তার ওপর।
সম্পদ আছে—গুরুত্ব আছে। ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ আছে—প্রয়োজন আছে। সুবিধা দিতে পারবে—সম্পর্ক আছে। আবার প্রয়োজন শেষ হলে অনেক সম্পর্কের উষ্ণতাও শেষ হয়ে যায়।
সব সম্পর্ককে এই সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু সুবিধাভিত্তিক সম্পর্কের বিস্তার যে আস্থাকে ক্ষয় করে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
কারণ একজন মানুষ প্রতারিত হলে শুধু একজনের ওপর আস্থা হারান না; কখনো কখনো তিনি মানুষের ওপরই আস্থা হারাতে শুরু করেন।
এভাবেই ব্যক্তিগত স্বার্থের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সামাজিক আস্থার সংকটে রূপ নেয়।
রাজনীতির প্রশ্নটি আরও গভীর। রাজনীতি মূলত জনস্বার্থের ব্যবস্থাপনা। তাই রাজনৈতিক পরিসরে স্বার্থের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, ক্ষমতার পরিবর্তনও থাকবে। এগুলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যখন ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা জনস্বার্থকে ছাপিয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—ক্ষমতা কি দায়িত্বের জায়গায় আছে, নাকি সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠছে?
এখানে কোনো ব্যক্তি বা দলকে এককভাবে দায়ী করার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
আমরা কি এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করছি, যেখানে নীতির চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান, জবাবদিহির চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর এবং জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বেশি লাভজনক?
এই প্রশ্নের উত্তর স্লোগানে পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বাস্তব আচরণ।
সত্যের সংকট, নাকি যাচাইয়ের সংকট? আজ তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ততা আছে। সমস্যা হলো—কোনটি সত্য, কোনটি দাবি, কোনটি অভিযোগ আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা—এই পার্থক্য করার অভ্যাস দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অভিযোগ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ নয়।
কোনো বক্তব্য ভাইরাল হলেই তা সত্য হয়ে যায় না। আবার কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই সেটিকে অস্বীকার করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
প্রয়োজন তথ্য যাচাই, প্রমাণের মূল্য এবং জবাবদিহি। কারণ একটি মিথ্যা তথ্য শুধু একজন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; কিন্তু ধারাবাহিক মিথ্যা পুরো সমাজের সত্যের ওপর আস্থা নষ্ট করতে পারে।
একটি রাষ্ট্রের সড়ক, সেতু, ভবন ও অর্থনৈতিক সম্পদ দৃশ্যমান। কিন্তু মানুষের পারস্পরিক আস্থা অদৃশ্য—তবু তার মূল্য অনেক গভীর।
নাগরিক যখন প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করেন, ব্যবসায়ী যখন ক্রেতাকে বিশ্বাস করেন, মানুষ যখন আইন ও নিয়মকে ন্যায্য মনে করেন—তখন সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রম সহজ হয়।
আর যখন সবাই প্রশ্ন করে—“কাকে বিশ্বাস করব?”—তখন শুধু সম্পর্ক নয়, প্রতিষ্ঠানও চাপে পড়ে।
আস্থার সংকট তাই কোনো আবেগগত বিষয়মাত্র নয়; এটি সামাজিক স্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
তবু স্বপ্নটাকে বিক্রি করা যাবে না। দুঃসময় আসবে। অভাব আসবে। ব্যর্থতা আসবে। কখনো মনে হবে—সব শেষ।
কিন্তু সব হারানো মানেই শেষ নয়।
অন্ধকার মাটির নিচে বীজ প্রথমে শুধু শিকড় মেলায়। বাইরে থেকে তার কোনো সাফল্য দেখা যায় না। তারপর একদিন সে অন্ধকার ভেদ করে আলোয় উঠে আসে।
মানুষও পারে। ঘর হারালে নতুন ঘর বানানো যায়। অর্থ হারালে আবার উপার্জন করা যায়। সম্পদ হারালে আবার অর্জনের চেষ্টা করা যায়। কিন্তু স্বপ্ন হারিয়ে গেলে সামনে এগোনোর শক্তিটিই দুর্বল হয়ে যায়।
তাই সংকট যত বড়ই হোক, স্বপ্ন বিক্রি করা যাবে না। আর স্বপ্ন রক্ষার নামে বিবেকও বিক্রি করা যাবে না। কারণ স্বপ্ন মানুষকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়, আর বিবেক তাকে পথ হারাতে দেয় না।
শেষ প্রশ্নটি আমাদেরই। সমাজের পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রের হাতে নয়। পরিবার, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি—সব জায়গাতেই নৈতিকতার চর্চা প্রয়োজন।
সততাকে দুর্বলতা এবং অন্যায় সুবিধাকে সাফল্য হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সত্যের জায়গায় আপস করা যাবে না। ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে। সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু তার ভিত্তি হবে বিশ্বাস—সুবিধা নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ: আমরা কী হারাচ্ছি—সম্পদ, সম্পর্ক, আস্থা, নাকি নিজেদের বিবেক?
সবকিছু হারিয়েও মানুষ আবার শুরু করতে পারে। কিন্তু বিবেক হারিয়ে মানুষ কোথা থেকে শুরু করবে?
তাই ঘর বিক্রি হোক, জমি বিক্রি হোক, শেষ সম্বলটুকুও চলে যাক—স্বপ্নটুকু বেঁচে থাকুক। আর স্বপ্নের পথ যত কঠিনই হোক, বিবেকটুকু যেন বিক্রি না হয়।
কারণ একটি সমাজের প্রকৃত দেউলিয়াত্ব তখনই, যখন মানুষের হাতে অনেক কিছু থাকে—শুধু নিজের কাছে নিজের কোনো মূল্য থাকে না।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯