আয়নায় মুখ ময়লা দেখলে আমরা সাধারণত আয়নাটিই মুছি। কারণ আমরা জানি—আয়না নোংরা হলে মুখ নোংরা হয় না; প্রতিচ্ছবিটা শুধু অস্পষ্ট হয়ে যায়। ধুলা সরিয়ে দিলে একই মুখ আবার পরিষ্কার দেখা যায়।
সমাজের অবস্থাও অনেকটা এমন। আমরা দেশ বদলাতে চাই, সমাজ বদলাতে চাই, প্রশাসন বদলাতে চাই, রাজনীতি বদলাতে চাই। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করি—যে সমাজ নিয়ে আমরা এত অভিযোগ করছি, সেই সমাজের অংশ হিসেবে আমার নিজের আয়নাটি কতটা পরিষ্কার?
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি, অথচ সুযোগ পেলে নিয়ম ভাঙি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, কিন্তু নিজের স্বার্থে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই। ঘুষখোরকে গালি দিই, অথচ কাজ দ্রুত করাতে ‘কিছু একটা’ দেওয়াকে স্বাভাবিক মনে করি। অসততার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিই, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য সত্যকে একটু বাঁকিয়ে বলতে দ্বিধা করি না। তাহলে প্রশ্ন—সমস্যাটি কোথায়? আয়নায়, নাকি ধুলায়?
ব্যক্তির হৃদয় বা ‘দিল’ও তেমনি। হৃদয় মূলত নষ্ট হয়ে জন্মায় না; লোভ, অহংকার, হিংসা, প্রতারণা, অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও গুনাহের আস্তরণ ধীরে ধীরে তাকে আচ্ছন্ন করে। বাইরে মানুষটি একই থাকে, কিন্তু ভেতরের স্বচ্ছতা হারিয়ে যায়।
ইসলাম এই অন্তরের পরিচ্ছন্নতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ শুধু মুখের একটি শব্দ নয়; এটি নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে ফিরে আসার আহ্বান। তবে শুধু জিহ্বায় ইস্তিগফার আর কাজে অন্যায়—এতে অন্তরের ধুলা সরে না। ক্ষমা প্রার্থনার সত্যতা প্রমাণ করতে হয় আচরণে।
অন্যের অধিকার মেরে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা সহজ; অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন। কাউকে অপমান করে পরে ক্ষমা চাওয়া সহজ; নিজের অহংকার ভেঙে ক্ষমা চাওয়া কঠিন। দুর্নীতির অর্থ রেখে দোয়া করা সহজ; হারাম উপার্জন ছেড়ে দেওয়া কঠিন।
কিন্তু আত্মশুদ্ধির পথটি সেখানেই। আমরা যদি সত্যিই সমাজ পরিবর্তন চাই, তাহলে পরিবর্তনের প্রথম ঠিকানা হতে হবে নিজের বিবেক।
একজন সৎ মানুষ একটি পরিবারকে প্রভাবিত করতে পারেন। একটি সৎ পরিবার একটি মহল্লাকে বদলাতে পারে। সৎ নাগরিকের সংখ্যা বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলোও বদলাতে বাধ্য হয়। আর যখন সততা, জবাবদিহি ও ন্যায়বোধ সামাজিক মূল্যবোধে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রের কাঠামোও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না।
রাষ্ট্র আসলে আকাশ থেকে তৈরি কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে মানুষ দিয়ে—নাগরিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা, শ্রমিক, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব—সবাই মিলে।
তাই রাষ্ট্রের দুর্নীতির দায় শুধু ‘ওদের’ নয়। সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েও আমাদের প্রত্যেকের কোনো না কোনো ভূমিকা আছে।
আমরা সন্তানকে ভালো ফল করতে বলি, কিন্তু ভালো মানুষ হতে কতটা বলি? তাকে সফল হতে শেখাই, কিন্তু অন্যের অধিকার সম্মান করতে শেখাই কি? তাকে বড় চাকরির স্বপ্ন দেখাই, কিন্তু ঘুষ না নেওয়ার দৃঢ়তা তৈরি করি কি?
একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতি বা অবকাঠামোয় নয়; তার নৈতিক চরিত্রেও নির্ধারিত হয়।
আজ আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজন আয়না ভাঙা নয়, ধুলা মোছা। রাজনীতিকে গালি দিয়ে রাজনীতি শুদ্ধ হবে না, যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আমরা নিজেরাই মিথ্যা, বিদ্বেষ ও অন্ধ আনুগত্যকে প্রশ্রয় দিই। প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে সমালোচনা করেও যদি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য অন্যায় তদবির করি, তাহলে পরিবর্তনের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সমাজকে অসহিষ্ণু বলেও যদি ভিন্নমতকে অপমান করি, তাহলে আমরাই সেই অসহিষ্ণুতাকে বাঁচিয়ে রাখি।
পরিবর্তন শুরু হয় ছোট জায়গা থেকে। নিজের আয় থেকে অন্যের প্রাপ্য আলাদা করা। নিজের ভুল স্বীকার করা। ঘুষ না দেওয়া, ঘুষ না নেওয়া। মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়া। দুর্বল মানুষের অধিকার না খাওয়া। ক্ষমতা পেলে প্রতিশোধ না নেওয়া। সন্তানকে সততার শিক্ষা দেওয়া। অন্যের সাফল্যে হিংসা না করে উৎসাহ দেওয়া।
এগুলো হয়তো বড় রাজনৈতিক স্লোগান নয়; কিন্তু এগুলোই একটি সুস্থ রাষ্ট্রের ভিত।
আর আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিদিনের ইস্তিগফার আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে—আমি ভুলের ঊর্ধ্বে নই। আমারও সংশোধনের প্রয়োজন আছে। তবে ইস্তিগফারকে যদি আমরা শুধু উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না রেখে আচরণে নিয়ে আসতে পারি, তখন সেটি ব্যক্তিজীবন থেকে সামাজিক জীবনে পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিদিন কয়েকবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা হয়তো ছোট একটি আমল; কিন্তু তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় আত্মসমালোচনা, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং মানুষের হক আদায় করার সংকল্প—তাহলে সেই ছোট আমলই বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
কারণ পরিষ্কার আয়নায় মুখ সুন্দর দেখায় না; সত্যিকারের মুখটি স্পষ্ট দেখায়। তেমনি পরিচ্ছন্ন হৃদয় মানুষকে নিজের দুর্বলতা দেখতে শেখায়। আর যে ব্যক্তি নিজের ভুল দেখতে শেখে, সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তিও অর্জন করে।
আমরা অনেকদিন ধরে দেশ বদলের কথা বলছি। এবার একটু নিজেকে বদলের কথাও বলি। অন্যের ঘরের ধুলা দেখার আগে নিজের দরজার ধুলা মুছি। অন্যের দুর্নীতি গোনার আগে নিজের অসততার হিসাব করি। অন্যের চরিত্র বিচার করার আগে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াই।
কারণ সমাজের প্রতিটি সংকটের পেছনে কোনো না কোনো মানুষের আচরণ আছে; আবার প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনের শুরুতেও একজন মানুষই দাঁড়ান।
আয়না নোংরা হলে আয়না ভাঙার প্রয়োজন নেই—ধুলা মুছতে হয়। সমাজ নোংরা হলে সমাজ ধ্বংসের প্রয়োজন নেই—মানুষের বিবেক জাগাতে হয়।
আর হৃদয়ে যখন গুনাহের ধুলা জমে, তখন শুধু আয়না বদলালে হবে না; নিজের ভেতরটাকেই পরিষ্কার করতে হবে।
হয়তো সেদিন আমরা আয়নায় শুধু নিজের চেহারা দেখব না—দেখব আমাদের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। আর সেই প্রতিচ্ছবি বদলাতে শুরু করলেই বদলাবে পরিবার, বদলাবে সমাজ, একদিন বদলাবে দেশও।
দেশ পরিবর্তনের সবচেয়ে ছোট, অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট হলো—আমি।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯