ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাবা যখন কাজে বের হন, তাঁর সঙ্গে শুধু একটি ব্যাগ বা বাজারের তালিকা থাকে না—থাকে পুরো পরিবারের দায়িত্ব। পকেটে সীমিত টাকা, অথচ চাহিদার তালিকা দীর্ঘ। মাসের শুরুতে যে হিসাবটা সম্ভব মনে হয়, মাসের শেষ দিকে এসে সেটিই হয়ে ওঠে কঠিন সমীকরণ।
তবু বাবা থামেন না। কারণ মধ্যবিত্ত সংসারে বাবার ক্লান্তির চেয়ে সন্তানের প্রয়োজন বড়, নিজের ইচ্ছার চেয়ে পরিবারের চাহিদা জরুরি।
আজকের মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্যে। বাজারের বাড়তি দাম, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়—সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়ে না। ফলে সংসারের বাজেটে সবার জন্য কিছু না কিছু বরাদ্দ থাকলেও বাবার নিজের জন্য বরাদ্দটি প্রায়ই শেষের দিকে চলে যায়।
সন্তানের নতুন বই দরকার—বাবার পুরোনো জামাই চলবে। সন্তানের কোচিং ফি দিতে হবে—নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসটি আরেক মাস পরে কেনা যাবে। সন্তানের জুতা ছিঁড়ে গেছে—বাবার জুতার তলা একটু মেরামত করলেই চলবে। সন্তানের চিকিৎসা জরুরি—নিজের শরীরের ব্যথা সাময়িকভাবে সহ্য করা যায়।
এই ‘চলবে’ শব্দটির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে বহু মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনীতি।
বাবা সাধারণত অভাবকে নাটক বানান না। তিনি সন্তানকে বলেন না—‘তোমার জন্য আমি কত কিছু ছাড়লাম।’ বরং নিজের প্রয়োজনকে ছোট করে দেখিয়ে সন্তানের প্রয়োজনকে বড় করে তোলেন। সংসারের টানাপোড়েন সন্তান যেন টের না পায়, সেজন্য অনেক বাবা মুখে হাসি রাখেন।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে প্রতিদিন কিছু স্বপ্ন নিলামে ওঠে। একটি নতুন জামা, একটু ভালো খাবার, নিজের চিকিৎসা, অবসর সময়ে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা—এসবের অনেক কিছুই ধীরে ধীরে ‘পরে হবে’ তালিকায় চলে যায়। আর সেই ‘পরে’ অনেক সময় আর আসে না।
এ কারণেই বাবার জীবন শুধু পারিবারিক আবেগের বিষয় নয়; এটি আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
যে সমাজে একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা সামান্য আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে, সেখানে অসুস্থতা, চাকরি হারানো, ব্যবসায় ক্ষতি কিংবা সন্তানের উচ্চশিক্ষার অতিরিক্ত ব্যয় পুরো পরিবারকে ঋণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে একজন বাবা শুধু বর্তমান সংসার চালান না; একই সঙ্গে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সঙ্গেও লড়াই করেন।
সবচেয়ে কঠিন সময় আসে যখন সন্তান বড় হয়ে যায়, কিন্তু বাবার দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষা শেষ করে সন্তানের চাকরি পেতে সময় লাগে। বিয়ে, বাসস্থান, চিকিৎসা কিংবা নতুন সংসার গড়ার প্রয়োজন আসে। বাবা তখন নিজের অবসর, সঞ্চয় কিংবা বার্ধক্যের নিরাপত্তা থেকে আরও কিছুটা সরিয়ে সন্তানের পাশে দাঁড়ান। ফলে অনেক বাবার অবসর মানে বিশ্রাম নয়; বরং নতুন ধরনের দায়িত্ব।
এখানেই আমাদের সামাজিক চিন্তার পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে একজন বাবা যদি নিজের বার্ধক্যকে অনিশ্চিত করে ফেলেন, তাহলে শুধু তাঁর আত্মত্যাগের প্রশংসা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিবার ও সমাজকে এমন ব্যবস্থা ও মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রবীণ মানুষকে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সন্তানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে না হয়।
তবে সন্তানের দায়িত্বও কম নয়। বাবা কখনো টাকা চাইবেন না—এই ধারণা ভুল। বাবা প্রয়োজন প্রকাশ করেন না বলেই তাঁর প্রয়োজন নেই, এমন নয়। বরং যিনি সারাজীবন দিয়েছেন, তিনি অনেক সময় চাইতে ভুলে যান।
তাই বাবার হাতে টাকা তুলে দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর প্রয়োজন বোঝা। তাঁর চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া, বিশ্রামের সময় নিশ্চিত করা, পুরোনো জামা দেখে নতুনটি কিনে দেওয়া, তাঁর সঙ্গে কিছু সময় বসা—এসবও সন্তানের দায়িত্বের অংশ।
একদিন সন্তানের হাতে প্রথম উপার্জনের টাকা আসে। সে বাবার হাতে তুলে দিতে চায়। বাবা হয়তো স্বভাবসুলভ হাসিতে হাত সরিয়ে বলেন—‘তোমার লাগবে, তুমি রাখো।’
কিন্তু সেই মুহূর্তে সন্তানের বোঝা উচিত—বাবার প্রয়োজন নেই বলে তিনি টাকা নিচ্ছেন না; সারাজীবন সন্তানের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে রেখেছেন বলেই আজও একই অভ্যাসে আছেন।
বাবার পকেট তাই কেবল অর্থের পকেট নয়। সেখানে জমা থাকে বহু বছরের হিসাব—কতবার নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েছেন, কতবার সন্তানের জন্য ধার করেছেন, কতবার অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজে গেছেন, কত স্বপ্ন পিছিয়ে দিয়েছেন।
মাসের শেষে তাঁর হাতে হয়তো টাকা থাকে না। কিন্তু সন্তানের হাতে বই থাকে, পায়ে জুতা থাকে, পড়াশোনার সুযোগ থাকে, ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা থাকে। এই জায়গাতেই মধ্যবিত্ত বাবার সবচেয়ে বড় অর্জন।
তিনি হয়তো নিজের জন্য সম্পদ তৈরি করতে পারেননি; কিন্তু সন্তানকে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। নিজের জীবনকে ছোট করে সন্তানের সম্ভাবনাকে বড় করেছেন।
তবে এই আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে আমাদের আরেকটি সত্য ভুলে গেলে চলবে না—বাবারও একটি জীবন আছে।
তাঁরও বিশ্রাম দরকার, চিকিৎসা দরকার, সম্মান দরকার, ভালোবাসা দরকার। সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পাশাপাশি বাবার বর্তমানটুকুও নিরাপদ হওয়া উচিত। একটি মানবিক পরিবার সেই পরিবার, যেখানে বাবা শুধু উপার্জনকারী নন—তিনি একজন মানুষ হিসেবেও মূল্যবান।
জীবন শেষ হওয়ার আগে মানুষ অনেক কিছু বুঝতে শেখে। কিন্তু বাবার ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষা দেরিতে পাওয়া উচিত নয়।
কারণ বাবার পকেট শূন্য হওয়ার শব্দ খুব ক্ষীণ। সেখানে কোনো হিসাবের খাতা শব্দ করে না, কোনো অভিযোগও শোনা যায় না। শুধু একদিন সন্তান বুঝতে পারে—বাবা নিজের জন্য খুব কমই খরচ করেছেন।
শূন্য ছিল না বাবার পকেট; শূন্য ছিল শুধু নিজের জন্য। সন্তানের জন্য সেখানে জমা ছিল একটি শৈশব, একটি ভবিষ্যৎ এবং তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বছরগুলো।
মধ্যবিত্ত বাবাদের প্রতি তাই শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন সামাজিক সম্মানও। আর সন্তানদের প্রতি আহ্বান—বাবা যতদিন পাশে আছেন, তাঁর নীরব ত্যাগকে পাঠ করতে শিখুন। কারণ চলে যাওয়ার পর শ্রদ্ধা জানানো যায়, কিন্তু তাঁর অপূর্ণ প্রয়োজনগুলো আর পূরণ করা যায় না।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯