জীবনে অন্ধকার নামলে মানুষ প্রথমে ভয় পায়। মনে হয়, পথ বন্ধ; সামনে আর কোনো সম্ভাবনা নেই। ব্যর্থতা, অর্থকষ্ট, প্রিয়জন হারানো, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষা—এসব মুহূর্ত মানুষকে ভেতর থেকে নড়িয়ে দেয়।
কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি—অন্ধকার শুধু পথ হারানোর নাম নয়, পথ খুঁজে পাওয়ারও একটি সময়?
বাতি জ্বালানোর প্রয়োজন হয় কখন? যখন চারপাশ অন্ধকার। দিনের আলোয় বাতির গুরুত্ব আমরা বুঝি না; অন্ধকারই তাকে প্রয়োজনীয় করে তোলে। জীবনের সংকটও অনেক সময় তেমন—যা আমাদের এমন কিছু দেখতে শেখায়, যা স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে চোখে পড়ে না।
সুখের সময়ে মানুষ নিজের সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে শেখে। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আছে—এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু একটি বিপর্যয়, একটি ব্যর্থতা কিংবা একটি অনিশ্চয়তা হঠাৎ সেই আত্মবিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরিয়ে দেয়। তখন মানুষ নিজের কাছে ফিরে আসে।
প্রশ্ন করে—আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? কী নিয়ে এত অহংকার ছিল? যাকে জীবনের সবকিছু ভেবেছিলাম, সে কি সত্যিই সবকিছু? আমার ভরসার জায়গা কোথায়? এই আত্মজিজ্ঞাসাই অনেক সময় অন্ধকারের সবচেয়ে বড় উপহার।
তবে বিপদকে রোমান্টিক করে দেখারও সুযোগ নেই। কষ্ট কষ্টই। শোকের ভার বাস্তব, অর্থকষ্টের যন্ত্রণা বাস্তব, অন্যায়ের আঘাতও বাস্তব। তাই বিপদে পড়া মানুষকে শুধু ‘ধৈর্য ধরুন’ বলা যথেষ্ট নয়; তার পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজন হলে সাহায্য করা এবং তার কষ্টকে সম্মান করাও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
তবু কঠিন সময় আমাদের একটি সত্য শেখায়—আজকের পরিস্থিতিই জীবনের শেষ সত্য নয়।
আল্লাহর ওপর ভরসা মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। দোয়ার সঙ্গে চেষ্টা, বিশ্বাসের সঙ্গে শ্রম এবং আশার সঙ্গে বাস্তব উদ্যোগ—এটাই মুমিনের পথ। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে হবে, ব্যর্থ হলে কারণ খুঁজে আবার চেষ্টা করতে হবে, অন্যায় হলে ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে হবে। আল্লাহর ওপর নির্ভরতা মানুষকে নিষ্ক্রিয় নয়, বরং আরও দায়িত্বশীল করে।
আমাদের হতাশার একটি বড় কারণ আজ অযথা তুলনা। অন্যের জীবনের সাফল্য আমরা দেখি, সংগ্রাম দেখি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি সুন্দর মুহূর্ত দেখে মনে করি, অন্যরা সবাই সুখী; শুধু আমিই পিছিয়ে আছি। অথচ প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন কিছু অন্ধকার আছে, যা ক্যামেরার বাইরে থাকে।
তাই অন্যের আলো দেখে নিজের রাতকে অভিশাপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, জীবনের কিছু দরজা বন্ধ হয় আমাদের থামানোর জন্য, আবার কিছু দরজা বন্ধ হয় ভুল পথ থেকে ফেরানোর জন্য। কোনো ব্যর্থতা হয়তো আমাদের নতুন করে প্রস্তুত করে। কোনো অপেক্ষা হয়তো আমাদের ধৈর্য শেখায়। কোনো হারানো হয়তো বুঝিয়ে দেয়—কোন জিনিস সত্যিই মূল্যবান।
আমরা প্রতিটি ঘটনার অন্তর্নিহিত হিকমত জানি না। তাই কোনো বিপদকে নিশ্চিতভাবে ‘আল্লাহর বিশেষ ইশারা’ বলে ব্যাখ্যা করাও ঠিক নয়। কিন্তু একজন বিশ্বাসী মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মশুদ্ধির সুযোগ খুঁজতে পারে। নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে, আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে পারে এবং নতুনভাবে জীবনকে সাজাতে পারে।
অন্ধকারের কাজ কখনো কখনো শুধু এটুকুই—আমাদের চোখকে আলোর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু আলো আসার অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। নিজের বাতিটিও জ্বালাতে হবে। একটি সৎ সিদ্ধান্ত, একটি নতুন উদ্যোগ, একটি ভুল স্বীকার, একটি ক্ষমা, একটি দোয়া কিংবা কারও পাশে দাঁড়ানোর ছোট্ট কাজ—এসবই হতে পারে সেই প্রদীপ, যা অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখায়।
যারা আজ কঠিন সময় পার করছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বার্তা হলো—নিজেকে শেষ মনে করবেন না। একটি ব্যর্থতা আপনাকে ব্যর্থ মানুষ বানায় না। একটি হারানো আপনার পুরো জীবনকে শূন্য করে না। একটি দীর্ঘ রাত প্রমাণ করে না যে সকাল আর আসবে না।
বরং কখনো কখনো রাতই মানুষকে শেখায়—আলোর মূল্য কত বেশি।
জীবনের অন্ধকার তাই সবসময় অভিশাপ নয়। কখনো সেটি সতর্কবার্তা, কখনো শিক্ষা, কখনো আত্মজিজ্ঞাসার আয়না। সেই অন্ধকার আমাদের জিজ্ঞেস করে—তুমি কি শুধু পরিস্থিতি বদলাতে চাও, নাকি নিজেকেও বদলাতে প্রস্তুত?
প্রশ্নটির উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। কারণ অন্ধকার নিজে আলো নয়; কিন্তু অন্ধকারই অনেক সময় মানুষকে আলো খুঁজতে বাধ্য করে।
তাই বিপদের সময়ে ভেঙে পড়ার আগে একটু থামুন। নিজের ভেতরে তাকান। যা হারিয়েছেন তার হিসাবের পাশাপাশি কী শিখেছেন, সেটিও ভাবুন। তারপর দোয়া করুন, চেষ্টা করুন এবং এগিয়ে চলুন।
হয়তো যে অন্ধকারকে আপনি আজ অভিশাপ ভাবছেন, সেটিই আপনাকে এমন এক আলোর সামনে দাঁড় করানোর প্রস্তুতি—যার মূল্য আপনি অন্ধকারে না পড়লে কখনো বুঝতেন না।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯