মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয়টি অনেক সময় কেউ দেখতে পায় না। কারণ সেটি ঘটে বাহিরে নয়, মানুষের নিজের ভেতরে। যে মানুষটি অর্থে বড় হয়েছে, ক্ষমতায় উঠেছে, পরিচিতিতে বিস্তৃত হয়েছে, চারপাশে মানুষের ভিড় তৈরি করেছে—সে হয়তো জানেই না, এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় কোথাও সে তার নিজের মানুষটিকেই হারিয়ে ফেলেছে।
তাই প্রশ্নটি আজ খুব জরুরি—নিজেকে হারিয়ে পৃথিবী জয়ের অর্থ কী?
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন সফলতার সংজ্ঞা ক্রমেই বস্তুগত হয়ে উঠছে। বড় বাড়ি, দামি গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালান্স, সামাজিক মর্যাদা, পদ-পদবি, অনুসারীর সংখ্যা—এসব দিয়েই যেন মানুষের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে। কে কতটা পেয়েছে, সেটিই আলোচনার বিষয়; কে কতটা মানুষ হয়ে উঠেছে, সেই প্রশ্নটি ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।
অথচ মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার চরিত্র। সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। আর সবচেয়ে বড় বিজয়—নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
মানুষের ভেতরে যেন দু’টি অদৃশ্য কবর। একটিতে নফস, অন্যটিতে রুহ। তুমি যাকে প্রতিদিন খাবার দাও, সে-ই জেগে ওঠে।
নফসের খাবার খুব সহজ—লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অহংকার, প্রতিহিংসা, ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অস্থিরতা। এগুলোকে যত প্রশ্রয় দেওয়া হয়, নফস তত শক্তিশালী হয়। তখন মানুষ নিজের ইচ্ছাকেই সত্য মনে করতে শুরু করে। ক্ষমতাকে অধিকার, সম্পদকে মর্যাদা আর প্রতিপত্তিকে শ্রেষ্ঠত্ব ভাবতে থাকে।
রুহের খাদ্য কিন্তু ভিন্ন। তার জন্য প্রয়োজন সত্য, সংযম, কৃতজ্ঞতা, ক্ষমা, বিনয়, নীরব আত্মজিজ্ঞাসা এবং সেজদা। রুহকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কখনো নিজের অহংকারকে ভাঙতে হয়, নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়, জবাব দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নীরব থাকতে হয়, প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও ক্ষমা করতে হয়।
এই জায়গাতেই মানুষ ও মানুষের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য তৈরি হয়।
আজ আমাদের চারপাশে অর্জনের প্রতিযোগিতা তীব্র। অন্যের সাফল্য যেন নিজের ব্যর্থতার আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অন্যের জীবনের সাজানো ছবি দেখি, অন্যের সুখের মুহূর্ত দেখি, অন্যের সাফল্যের গল্প শুনি; তারপর নিজের জীবনের সঙ্গে তার তুলনা করি। নিজের যা আছে, তা ছোট মনে হয়; যা নেই, সেটিই বড় হয়ে ওঠে। এভাবেই নফস ক্ষুধার্ত থেকে যায় না—বরং প্রতিদিন নতুন খাবার পায়।
অন্যের প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিজের রিজিক বদলানো যায় না। অন্যের প্রাপ্তি কমলে নিজের প্রাপ্তি বাড়ে না। প্রত্যেক মানুষের জীবনের হিসাব আলাদা। তাই তুলনার আগুনে নিজের শান্তি পুড়িয়ে ফেলার কোনো অর্থ নেই।
ইহকালের মোহের সবচেয়ে বড় প্রতারণা এখানেই—এটি মানুষকে প্রয়োজন আর লোভের পার্থক্য ভুলিয়ে দেয়।
প্রয়োজনের সীমা আছে, লোভের নেই। একটি বাড়ি প্রয়োজন থেকে প্রাসাদে পরিণত হয়; একটি প্রয়োজনীয় সম্পদ একসময় অহংকারের প্রতীকে পরিণত হয়; সম্মান একসময় ক্ষমতার নেশায় বদলে যায়। মানুষ তখন সম্পদের মালিক থাকে না—সম্পদই ধীরে ধীরে তার মালিক হয়ে যায়।
কিন্তু মৃত্যুর কাছে এসব হিসাবের কোনো স্থায়ী মূল্য নেই।
যে ঘর নিয়ে এত অহংকার, একদিন সেটি অন্যের হয়ে যাবে। যে জমি নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করেছি, সেটি আমাদের সঙ্গে যাবে না। যে পদমর্যাদার জন্য মানুষকে ছোট করেছি, মৃত্যুর পর সেই পরিচয়ও মাটির নিচে থেমে যাবে। ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান, খ্যাতি—সবই থেকে যাবে পৃথিবীতে; মানুষটি চলে যাবে একা।
তাহলে এত আয়োজন কিসের? জীবন কি শুধু বেশি পাওয়ার জন্য, নাকি ভালো হওয়ার জন্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সাফল্যের ধারণাটিই নতুন করে ভাবতে হবে। মানুষের বড় হওয়া মানে অন্যকে ছোট করা নয়। বড় হওয়া মানে ক্ষমতা পেয়েও বিনয়ী থাকা। অর্থ থাকা সত্ত্বেও লোভী না হওয়া। কষ্ট পেয়েও অন্যায় না করা। সুযোগ পেয়েও দুর্বলকে ঠকানো না। নিজের ভুল বুঝতে পারা এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাওয়া।
সত্যিকারের মানুষ তিনি নন, যার সামনে সবাই ভয়ে নত হয়; সত্যিকারের মানুষ তিনি, যার কাছে একজন দুর্বল মানুষও নিরাপদ বোধ করে।
আমরা প্রায়ই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি। তাদের ভালো শিক্ষা দিতে চাই, সম্পদ রেখে যেতে চাই, প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। কিন্তু সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কি শুধু সম্পদ? আমরা যদি তাদের অর্থ দিই, অথচ বিবেক না দিই; প্রতিযোগিতা শেখাই, কিন্তু সহমর্মিতা না শেখাই; সাফল্য শেখাই, কিন্তু সততা না শেখাই—তবে আমরা হয়তো একজন সফল মানুষ তৈরি করব, কিন্তু একজন ভালো মানুষ নয়।
সমাজের সংকটও এখানেই। মানুষ যত বেশি নিজের ভেতর থেকে দূরে সরে যায়, সমাজ তত বেশি বাহ্যিক চাকচিক্যে সমৃদ্ধ হলেও নৈতিকভাবে দরিদ্র হয়। তখন দুর্নীতি শুধু অফিসে থাকে না, প্রবেশ করে বিবেকে। প্রতারণা শুধু ব্যবসায় থাকে না, ঢুকে পড়ে সম্পর্কের ভেতর। মিথ্যা শুধু মুখে থাকে না, ধীরে ধীরে চরিত্রের অংশ হয়ে যায়।
রুহ একদিনে মরে না। একটু একটু করে মরে।
যখন অন্যের কষ্টে হৃদয় নড়ে না, অন্যের সাফল্যে আনন্দ হয় না, অন্যায় করেও অনুতাপ আসে না, ক্ষমা করতে নিজের মর্যাদা কমে যায় মনে হয়—তখন বুঝতে হবে, ভেতরের মানুষটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
তবে ফিরে আসার দরজা বন্ধ হয় না।
একটি আন্তরিক ক্ষমা, একটি অন্যায় সংশোধন, কারও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, কারও চোখের পানি মুছে দেওয়া, নির্জনে সেজদায় নিজের অহংকার ভেঙে দেওয়া—এসব দিয়েই মানুষ আবার নিজের কাছে ফিরে আসতে পারে।
কারণ মানুষ হওয়া কোনো একদিনের অর্জন নয়; এটি প্রতিদিনের সাধনা।
প্রতিদিন আমাদের সামনে দুটি পথ থাকে—নফসকে আরও শক্তিশালী করা, অথবা রুহকে জাগিয়ে তোলা। আমরা যেটিকে খাওয়াব, শেষ পর্যন্ত সেটিই আমাদের জীবনকে পরিচালনা করবে।
একদিন পৃথিবীর সব প্রতিযোগিতা থেমে যাবে। সব পদ, পরিচয়, সম্পদ ও প্রশংসার শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। তখন হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়াবে—তুমি কতটা পেয়েছিলে, তা নয়; তুমি কতটা মানুষ হয়ে উঠেছিলে।
তাই পৃথিবী জয়ের আগে নিজেকে জয় করা দরকার। কারণ নিজের নফসের কাছে পরাজিত একজন মানুষ পৃথিবীর কাছে যতই সফল হোক, তার বিজয় অসম্পূর্ণ।
নিজেকে হারিয়ে পৃথিবী জয়ের কোনো অর্থ নেই।
বরং এমন জীবনই হোক আমাদের সাধনা—যেখানে সম্পদ থাকবে, কিন্তু সম্পদের অহংকার থাকবে না; ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু অন্যায়ের ব্যবহার থাকবে না; সাফল্য থাকবে, কিন্তু মানুষের প্রতি মমতা হারাবে না।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার রেখে যাওয়া সম্পদে নয়, রেখে যাওয়া মানবিকতায় বেঁচে থাকে।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯