সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ তার চরিত্র দিয়ে নয়, পরিচয় দিয়ে মূল্যায়িত হতে শুরু করে। তখন সত্যের চেয়ে স্লোগান, সততার চেয়ে আনুগত্য এবং যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতার নৈকট্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাহ্যিক পরিচয় বদলে যায়, কিন্তু ভেতরের মানুষটি বদলায় না।
আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এমন এক শ্রেণির উত্থান ঘটেছে, যাদের কোনো স্থায়ী আদর্শ নেই—আছে কেবল সময় বুঝে অবস্থান নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা। তারা যে পতাকা হাতে ক্ষমতার কাছে যায়, ক্ষমতার রং বদলালে সেই পতাকাও বদলে ফেলে। কিন্তু তাদের স্বার্থ, সুবিধাবাদ ও চরিত্রের মৌলিক কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।
পতাকা বদলায়, চরিত্র বদলায় না।
এরা কখনো গণতন্ত্রের সৈনিক, কখনো পরিবর্তনের অগ্রদূত, কখনো দেশপ্রেমিক, কখনো সমাজসেবক। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচয়ের পোশাক বদলায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—পরিচয় বদলালেই কি অতীত মুছে যায়? স্লোগান বদলালেই কি চরিত্রের দাগ মুছে যায়? ক্ষমতার নতুন দরজায় দাঁড়ালেই কি পুরোনো হিসাব অকার্যকর হয়ে যায়?
উত্তর—না।
চরিত্র কোনো ব্যানার নয় যে প্রয়োজনমতো বদলে নেওয়া যায়। চরিত্র মানুষের দীর্ঘদিনের আচরণ, সিদ্ধান্ত, মূল্যবোধ ও সংকটের সময়ে তার অবস্থানের সমষ্টি। সুবিধার সময়ে সবাই নীতির কথা বলতে পারে; কিন্তু নীতির মূল্য দিতে হয় যখন সুবিধা বিপরীতে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, আমরা অনেক সময় এই সুবিধাবাদীদের শুধু সহ্য করি না—তাদের পুরস্কৃতও করি। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই সামাজিক মর্যাদা বাড়ে, অর্থ থাকলেই প্রভাব বাড়ে, বড় পদ থাকলেই যোগ্যতার সনদ পাওয়া যায়। ফলে সৎ মানুষ পিছিয়ে পড়ে এবং সুযোগসন্ধানী মানুষ সামনের সারিতে উঠে আসে।
এখানেই রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট।
যখন একজন যোগ্য মানুষ কেবল নিজের বিবেকের কারণে উপেক্ষিত হন, অথচ একজন সুবিধাবাদী ব্যক্তি আনুগত্যের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পান, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো প্রতিষ্ঠান।
একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ব্যক্তি নয়, নীতি প্রাধান্য পায়; পরিচয় নয়, যোগ্যতা মূল্যায়িত হয়; আনুগত্য নয়, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু যখন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক আনুগত্য ও স্বার্থের বিনিময়ের ওপর দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রের কাঠামো বাইরে থেকে যত শক্তিশালীই দেখাক, ভেতরে ভেতরে তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে।
এই সংকটের জন্য শুধু রাজনীতিবিদদের দায়ী করলেই চলবে না। সমাজেরও দায় আছে। কারণ আমরা অনেক সময় সত্যের চেয়ে সুবিধাকে বেছে নিই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পাই, কারণ প্রতিবাদ করলে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে দ্বিধা করি, কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তি হয়তো প্রভাবশালী। যোগ্যতার পক্ষে দাঁড়াতে চাই না, কারণ তাতে ব্যক্তিগত লাভ নেই।
এই নীরবতাই সুবিধাবাদীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
একটি সমাজে যখন মানুষ বুঝে যায় যে চরিত্রের চেয়ে ক্ষমতা বেশি মূল্যবান, তখন চরিত্রবান মানুষও একসময় নিরুৎসাহিত হয়। আর যখন অসৎ মানুষ বারবার পুরস্কৃত হয়, তখন অসততা ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
তাই পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদলে আসবে না। পতাকা বদলালেই নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয় না। নেতৃত্ব বদলালেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না। সরকার বদলালেই প্রশাসনের নৈতিকতা ফিরে আসে না।
প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হবে তখনই, যখন আমরা মানুষকে তার কোন পতাকা বহন করে তা দিয়ে নয়, কোন মূল্যবোধ ধারণ করে তা দিয়ে বিচার করব।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব; ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থ; ক্ষমতার ঊর্ধ্বে আইন এবং স্লোগানের ঊর্ধ্বে সত্যের অবস্থান থাকবে।
কারণ পতাকা একটি কাপড়। সেটি বদলানো সহজ।
পরিচয়ও বদলানো যায়।
ভাষা বদলানো যায়।
স্লোগান বদলানো যায়।
কিন্তু চরিত্র বদলানো কঠিন।
আর সেই কঠিন কাজটিই আমাদের করতে হবে—ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের; রাজনীতির নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির; সরকারের নয়, সমাজের নৈতিক মানসিকতার।
আমাদের মনে রাখতে হবে—যে মানুষ শুধু পতাকা বদলায়, সে হয়তো সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়; কিন্তু যে মানুষ নিজের বিবেককে বদলায় না, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকেই আলাদা করে চিনে রাখে।
পতাকা বদলানো কোনো অপরাধ নয়।
অপরাধ তখনই, যখন পতাকা বদলে অতীতের দায় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কোন পতাকা ক্ষমতায় আছে—শুধু তা নয়; বরং সেই পতাকার নিচে দাঁড়ানো মানুষগুলোর চরিত্র কেমন, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
কারণ শেষ পর্যন্ত পতাকা ইতিহাসের ছবি হতে পারে, কিন্তু চরিত্রই ইতিহাসের সাক্ষ্য।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯