✍️ আতাউর রহমান
"বাতাসের গতি বদলায়, বয়স থেমে যায় মৃত্যুর কাছে, সময় বয়ে চলে—কিন্তু মৃত্যু একমাত্র শতভাগ নিশ্চিত সত্য।"
মানুষ এমন এক অদ্ভুত প্রাণী, যে নিশ্চিত সত্যকে সবচেয়ে বেশি অস্বীকার করে, আর অনিশ্চিত স্বপ্নের পেছনেই সবচেয়ে বেশি ছুটে বেড়ায়। আমরা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করি, সম্পদের পাহাড় গড়ি, ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চাই, সম্পর্কের হিসাব করি, প্রতিযোগিতায় জিততে চাই—কিন্তু জীবনের একমাত্র অবধারিত পরিণতি, মৃত্যুর কথা সচেতনভাবে ভুলে থাকতে চাই।
বাতাসের গতি বদলে যায়। আজ যে ঝড়, কাল তা নিস্তব্ধতা। সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না; সে নিজের গতিতে বহমান। বয়সও একসময় মৃত্যুর দরজায় এসে থামে। কিন্তু মৃত্যু—সে কখনো নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না। সে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, জ্ঞানী-মূর্খ, ধর্মীয়-অধর্মীয়—কাউকেই ছাড় দেয় না। তাই পৃথিবীর ইতিহাসে যদি কোনো বিষয় শতভাগ নিশ্চিত হয়ে থাকে, তবে তা একমাত্র মৃত্যু।
অথচ আমাদের জীবনযাপন যেন এই সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রতিবেশীর সঙ্গে সামান্য জমি নিয়ে বছরের পর বছর মামলা চলে। দুই ভাই উত্তরাধিকার নিয়ে একে অপরের মুখ দেখে না। কেউ সামান্য পদ-পদবির জন্য বিবেক বিসর্জন দেয়। কেউ ক্ষমতার অহংকারে মানুষকে অপমান করে। আবার কেউ অর্থের মোহে নিজের সততাকেই বিক্রি করে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই একই সাদা কাপড়ে, একই নীরবতার ভেতর, একই গন্তব্যে যাত্রা করে।
প্রতিদিন আমরা মৃত্যুর সংবাদ শুনি। পরিচিত কেউ, প্রতিবেশী কেউ, সহকর্মী কেউ—হয়তো গতকালও যার সঙ্গে কথা হয়েছে, আজ তিনি নেই। কিছুক্ষণ শোক প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি বাক্য লিখি, জানাজায় অংশ নিই; তারপর আবার এমনভাবে পৃথিবীর মোহে ডুবে যাই, যেন মৃত্যুর তালিকায় আমাদের নাম কোনো দিনই উঠবে না। এ এক অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনা।
জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—স্থায়িত্বের অহংকার নয়, অস্থায়িত্বের উপলব্ধি। যে মানুষ বুঝতে পারে তার সময় সীমিত, সে সাধারণত ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসাকে, প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাকে, লোভের চেয়ে সততাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কারণ সে জানে, সঙ্গে করে কিছুই নেওয়া যাবে না; রেখে যেতে হবে শুধু কর্ম, চরিত্র এবং মানুষের হৃদয়ে নিজের পরিচয়।
একটি কবরস্থানে গেলে সব পরিচয়ের পার্থক্য মুছে যায়। সেখানে কোনো চেয়ারম্যান নেই, কোনো মন্ত্রী নেই, কোনো ধনকুবের নেই, কোনো প্রভাবশালী নেই। আছে কেবল কিছু নাম, কিছু জন্ম-মৃত্যুর তারিখ, আর নিঃশব্দে শুয়ে থাকা মানুষের ইতিহাস। জীবনের সমস্ত অহংকার সেখানে এসে সমান হয়ে যায়।
তাই মৃত্যুচিন্তা ভয়ের বিষয় নয়; এটি জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। যে মানুষ মৃত্যুকে মনে রাখে, সে জীবনের মূল্যও সবচেয়ে বেশি বোঝে। সে জানে, প্রতিটি সকাল একটি নতুন সুযোগ, প্রতিটি সন্ধ্যা একটি হিসাব, আর প্রতিটি নিঃশ্বাস একটি আমানত।
আমরা হয়তো বাতাস থামাতে পারি না, সময় আটকে রাখতে পারি না, বয়স ফিরিয়ে আনতে পারি না। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি—বাকি সময়টুকু কেমন মানুষ হয়ে বাঁচব। কারণ মৃত্যু নিশ্চিত, কিন্তু মৃত্যুর আগে আমাদের জীবন কেমন হবে—সেই সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের হাতেই।
হয়তো এ কারণেই মানুষের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা দীর্ঘজীবী হওয়ায় নয়; বরং সীমিত জীবনকে অর্থবহ করে তোলায়।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯