“প্রশ্ন হোক প্রশাসনের কাজে, আক্রমণ নয় ব্যক্তিতে।”
সুশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত প্রশাসনের জবাবদিহি। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—অভিযোগ করার ক্ষেত্রেও সত্য, তথ্য, প্রমাণ ও শালীনতার সীমারেখা মেনে চলা। এই দুইয়ের কোনো একটিকে বাদ দিয়ে একটি সুস্থ প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদারকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এডভোকেট মো. আমান উদ্দিনের একটি বক্তব্য প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ওই বক্তব্যে একটি ডেথ সার্টিফিকেট নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
একজন নাগরিকের এমন অভিযোগ করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে তার প্রতিকারও প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণের সামঞ্জস্য এবং ভাষার শালীনতা থাকাও সমান জরুরি।
একটি আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়েছে কি না—তা নথি, আবেদনের তারিখ, ফাইলের গতিপথ, তদন্তের নির্দেশ এবং তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করে নির্ধারণ করা সম্ভব। কোথায় বিলম্ব হয়েছে, কেন হয়েছে এবং এর জন্য কে দায়ী—তাও প্রশাসনিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের করা যায়।
কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সেবা পেতে বিলম্বের অভিযোগ থেকে সরাসরি ঘুষ, দালালি, গোপন আর্থিক লেনদেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগে পৌঁছাতে হলে স্বাভাবিকভাবেই আরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
এখানেই অভিযোগ ও অপপ্রচারের মধ্যকার সীমারেখাটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার। কিন্তু সেই সমালোচনা যখন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অপমান, অবমাননা কিংবা চরিত্রহননের ভাষায় পরিণত হয়, তখন তা আর গঠনমূলক সমালোচনার পর্যায়ে থাকে না।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাব প্রশাসনিক যুক্তি, আইন, বিধি ও তথ্য দিয়ে চাওয়া যায়—ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে নয়।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলার প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী। আইনশৃঙ্খলা, ভূমি প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সরকারি প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা, ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক কমিটির দায়িত্বও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর থাকে।
ফলে তাঁর কার্যক্রম নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা, প্রশ্ন কিংবা সমালোচনা থাকা স্বাভাবিক।
বর্তমান ইউএনও উম্মে হাবিবা মজুমদারকে আমার পর্যবেক্ষণে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে বেশ সক্রিয় মনে হয়েছে। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে বিপুলসংখ্যক প্রশাসনিক ও সমন্বয়মূলক দায়িত্ব পালন করাও সহজ বিষয় নয়।
তবে এটিও স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—এটি কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্ধ সমর্থনের অবস্থান নয়। আমার অবস্থান বরাবরই এক ও অভিন্ন: ভালো কাজের প্রশংসা যেমন করতে হবে, তেমনি অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণসহ দাঁড়াতেও হবে।
আমার পর্যবেক্ষণে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার একটি ইতিবাচক দিক হলো—তদবিরনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় না দেওয়ার প্রবণতা। সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা সুপারিশ যেন সিদ্ধান্তের প্রধান নিয়ামক না হয়—এটাই একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য।
কোনো কর্মকর্তা যদি বিধি ও নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেন, তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ইতিবাচক।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো কর্মকর্তাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে। আইনসঙ্গত কোনো আবেদন অযথা আটকে রাখা, আবেদনকারীকে অহেতুক ঘোরানো কিংবা সেবা প্রদানে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ঘটানো হলে তার জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের সমাজে একটি অস্বাস্থ্যকর মানসিকতা তৈরি হয়েছে—“কাজ হয়ে গেলে কর্মকর্তা ভালো, কাজ না হলে কর্মকর্তা খারাপ।”
অথচ প্রশাসনের দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যাশা পূরণ করা নয়; দায়িত্ব হলো আইন ও বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। একইভাবে আইনসঙ্গত কাজ অকারণে বিলম্বিত করাও কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব নয়।
তাই কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সামগ্রিক প্রশাসনিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করে অভিযোগের নথি ও প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।
বিয়ানীবাজারে সাধারণ মানুষের হয়রানির প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি, নামজারি, উত্তরাধিকার, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ কিংবা বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মানুষ যদি মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের কাছে জিম্মি হয়, সেটি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলা দরকার।
দালালচক্র থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণসহ ব্যবস্থা দাবি করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা ঘুষ চাইলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে হবে। কোনো সরকারি কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা দাবি করাও নাগরিকের অধিকার।
কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেও রাখা দরকার—
ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগার পর আমরা যতটা সোচ্চার হই, জনস্বার্থে হয়রানি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কি ততটাই ধারাবাহিক?
শুধু নিজের কাজ আটকে গেলে প্রশাসনের সমালোচনা করা আর দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, দালালি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা এক বিষয় নয়।
প্রশাসনের কাছেও নাগরিকের প্রত্যাশা রয়েছে। কোনো আবেদন কেন বিলম্বিত হচ্ছে, তদন্ত কোথায় আটকে আছে, সংশ্লিষ্ট নথি কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব বিষয়ে নাগরিককে যথাসম্ভব পরিষ্কার তথ্য দেওয়া উচিত।
ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং, অনলাইন আবেদন এবং সেবা গ্রহণের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা আরও কার্যকর হলে নাগরিকের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি অভিযোগ ও ভুল বোঝাবুঝিরও অবকাশ কমবে।
প্রশাসনের স্বচ্ছতা শুধু কর্মকর্তার ভাবমূর্তির জন্য নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরির জন্যও অপরিহার্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মতপ্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু এখানে একটি পোস্ট মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে কারও ছবি ব্যবহার করে যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা প্রমাণ ছাড়া গুরুতর অপরাধের সঙ্গে কাউকে যুক্ত করে উপস্থাপন করা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
কোনো বক্তব্য আইনগত অপরাধ কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে নৈতিক দায়িত্ব আমাদের সবার—
তথ্য যাচাই ছাড়া কাউকে জনসমক্ষে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
সমালোচনা হবে, প্রশ্ন হবে, প্রতিবাদ হবে—কিন্তু ভাষা হবে সংযত, বক্তব্য হবে তথ্যনির্ভর এবং অভিযোগ হবে প্রমাণসমৃদ্ধ।
একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা যাবে, তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যাবে এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যাবে। আবার একজন সরকারি কর্মকর্তার পদমর্যাদাও তাঁকে জনগণের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে না। তিনি জনগণের সেবায় নিয়োজিত; তাই তাঁর সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অর্থাৎ বিষয়টি কোনোভাবেই ‘প্রশাসন বনাম জনগণ’ নয়।
প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে জনগণ নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারবেন এবং প্রশাসনও নিরপেক্ষভাবে সেই অভিযোগ যাচাই করবে।
বিয়ানীবাজারের প্রয়োজন দালালমুক্ত, তদবিরমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ—যেখানে অন্যায় হলে প্রতিবাদ হবে, অনিয়ম হলে প্রমাণ হাজির হবে; কিন্তু ব্যক্তিগত ক্ষোভকে জনস্বার্থের অভিযোগের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হবে না।
শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি উম্মে হাবিবা মজুমদার বা এডভোকেট মো. আমান উদ্দিন—কাউকে কেন্দ্র করে বিতর্ককে সীমাবদ্ধ রাখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যাবে।
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—
বিয়ানীবাজারে সরকারি সেবা কতটা সহজ?
প্রশাসন কতটা স্বচ্ছ?
সাধারণ মানুষ কতটা হয়রানিমুক্ত?
অভিযোগের প্রতিকার কতটা কার্যকর?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই হবে।
প্রশাসনের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রশাসনের জবাবদিহিও অপরিহার্য। নাগরিকের অভিযোগের অধিকার যেমন অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, তেমনি সেই অভিযোগের ভাষা ও ভিত্তিতেও দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে।
কারণ সুশাসন শুধু ভালো প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক—উভয়ই।
সুতরাং আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট—
প্রশাসনের জবাবদিহি যেমন চাই, অভিযোগেরও চাই তেমন শালীনতা।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯