Π -আতাউর রহমান
শহরের রাত আজ আলোর মালায় সজ্জিত। কিন্তু আমাদের গ্রামগুলোর রাত এখনো অন্ধকারে ডুবে থাকে। সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং হয়। তবে বিদ্যুতের এই ঘাটতির চেয়েও ভয়াবহ এক লোডশেডিং বহুদিন ধরে গ্রামবাংলাকে গ্রাস করে রেখেছে—সেটি হলো রাজনৈতিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লোডশেডিং।
এই লোডশেডিংয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় তখন, যখন কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের বাইরে গিয়ে জনকল্যাণের কথা বলেন। গ্রামগুলোতে এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়, কাজের চেয়ে প্রচার এবং অবদানের চেয়ে পদ-পদবী অধিক মূল্য পায়। কে কোন কমিটির সভাপতি, কার নামের আগে কতটি উপাধি, কার সঙ্গে কার সখ্য—এসবই যেন সামাজিক মর্যাদার অলিখিত সূচক।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, পদ-পদবীর দৌরাত্ম্যে অযোগ্যদের হুংকার প্রায়ই যোগ্যদের নীরবতাকে ছাপিয়ে যায়। অথচ একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, যারা গ্রামের সম্মিলিত কাজের খুঁত খুঁজে বেড়ায়, তারা কিংবা তাদের পূর্বপুরুষদের অবদান সেই গ্রামের ইতিহাসে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। সমালোচনা তাদের চর্চা, কিন্তু সৃজনশীলতা নয়; প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি তাদের অভ্যাস, কিন্তু নেতৃত্ব নয়।
গ্রামের মানুষ ইহকালের চেয়ে পরকালের কথা বেশি ভাবেন—এটি কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং এটি আমাদের সমাজের একটি আধ্যাত্মিক শক্তি। কিন্তু সেই বিশ্বাস যখন লৌকিকতার আবরণে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। ধর্ম তখন আর আত্মশুদ্ধির অনুশীলন থাকে না; বরং সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যম হয়ে ওঠে। অন্তরের পরিশুদ্ধির পরিবর্তে বাহ্যিক আয়োজনই হয়ে ওঠে মুখ্য।
এই বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় গ্রামের স্কুল, মক্তব ও মাদ্রাসাগুলোতে। যখনই কোনো শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা সচেতন নাগরিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তখনই শুরু হয় রাজনৈতিক লোডশেডিং। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যায়, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয় এবং জনস্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জিম্মি করে ফেলা হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। একটি শিশুর বৃত্তি অর্জন শুধু একটি সনদ নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য এবং একটি সমাজের সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু গ্রামগুলোর নীরব ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক সময় মেধা পরাজিত হয় প্রভাবের কাছে। কচি-কাঁচা শিক্ষার্থীরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, হারিয়ে ফেলে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা।
একসময় গ্রামের শিক্ষকরা ছিলেন সমাজের বিবেক। তাঁদের পরামর্শ ছিল গ্রহণযোগ্য, তাঁদের অবস্থান ছিল মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু আজ তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই “মাস্টারসাব”—সম্মানসূচক একটি সম্বোধনমাত্র। সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাঁদের উপস্থিতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অথচ সমাজের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে সেই শিক্ষকদেরকেই আবার সামনে দাঁড়াতে হয়।
আমি নিজেও একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ছত্রিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে রুটিনের একটি ক্লাসও মিস করিনি। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর বিনয়। শিক্ষকের ‘ইগো’ থাকা উচিত নয়; থাকা উচিত আত্মমর্যাদাবোধ। কারণ, ইগো মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, আর আত্মমর্যাদা মানুষকে নীতিতে অটল রাখে। একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো পদ-পদবীর জন্য কাজ করেন না; তিনি কাজ করেন আগামী প্রজন্মের জন্য।
শিক্ষকতা জীবনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় বহুবার দেখেছি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে সমাজের অদৃশ্য দেয়ালের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে। কাজ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, ফটোসেশনের রাজনীতি দিয়ে প্রকৃত কাজকে আড়াল করার প্রয়াস দেখা গেছে। তখন সহকর্মীরা বলতেন, “আপনি তো পারেন; আমরা হলে থেমে যেতাম।” আমি তাদের বলেছি, গন্তব্য ঠিক থাকলে পথ বদলানো যেতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য নয়। কারণ, শিক্ষা মানুষকে শুধু পড়তে শেখায় না; শিক্ষা মানুষকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে শেখায়।
আজ প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের গ্রামগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট কি বিদ্যুতের লোডশেডিং, নাকি বিবেকের লোডশেডিং? কারণ, বিদ্যুতের আলো কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে আসে; কিন্তু বিবেকের আলো একবার নিভে গেলে তা ফিরিয়ে আনতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।
অতএব, সময় এসেছে নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি কেবল পদ-পদবীর অলংকারে নিজেদের সাজিয়ে রাখব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আলোকিত সমাজ নির্মাণ করব? কারণ, একটি গ্রামের প্রকৃত উন্নয়ন মাপা হয় না তার তোরণ, ব্যানার কিংবা সংবর্ধনার সংখ্যায়; মাপা হয় তার শিশুদের স্বপ্ন, পারিবারিক মর্যাদা এবং মানুষের বিবেকের আলো দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত, গ্রামের উন্নয়ন কোনো ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়; এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা। আর সেই যাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা বিদ্যুতের অন্ধকার নয়—মানুষের মননের অন্ধকার। সেই অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯