লেখক-Π মো: বিলাল উদ্দিন
নাগরিকতা কেবল একটি রাষ্ট্রের পরিচয়পত্র ধারণের নাম নয়; এটি একটি দায়িত্ববোধ, একটি মূল্যবোধ এবং একটি সভ্য সামাজিক চুক্তি। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, মত ও পথের ভিন্নতাকে সম্মান করা, মানবিকতা ও সহনশীলতার চর্চা, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং নিজের কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়েই প্রকৃত নাগরিকতার বিকাশ ঘটে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে আজ এসব মৌলিক গুণাবলির জায়গায় ক্রমেই স্থান করে নিচ্ছে বিভাজন, বিদ্বেষ এবং অসহিষ্ণুতা।
বর্তমান বাস্তবতায় রাজনীতি থেকে সমাজনীতি, উন্নয়ন থেকে সংস্কৃতি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভক্তির রেখা ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠছে। মতের অমিল যেন শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বাস্তব জীবনে, সামান্য ভিন্নমত প্রকাশ করলেই ব্যক্তি আক্রমণ, কটূক্তি কিংবা নানা ধরনের অপবাদে জর্জরিত হতে হচ্ছে। যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিহত্যার সংস্কৃতি যেন আমাদের নতুন সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
খেলাধুলা, যা হওয়া উচিত আনন্দ, সম্প্রীতি ও বিনোদনের মাধ্যম, সেটিও আজ অনেক ক্ষেত্রে সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি খেলার ফলাফলকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, মারামারি কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা সভ্য সমাজের কোনো চিত্র হতে পারে না। একইভাবে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান, মব আক্রমণ, ভিন্নমতাবলম্বীদের বাড়িঘর বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে আরও প্রকট করে তুলছে।
আইনের শাসনের পরিবর্তে প্রতিহিংসার সংস্কৃতি সমাজে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলছে। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ কিংবা ভিন্ন মতকে রাষ্ট্রবিরোধিতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়। কখনো কখনো মনে হয়, একটি ক্ষুদ্র সমস্যার সমাধানে অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা চলছে; যেন মশা মারতে কামান দাগা হচ্ছে।
অন্যদিকে অপরাধপ্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দখলদারিত্ব, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই কিংবা নানা ধরনের প্রতারণা সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা হতাশার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মূল্যবোধের অবক্ষয়। ইতিহাস ও বর্তমানের মধ্যে যে সত্যভিত্তিক সংযোগ থাকার কথা, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কেউ ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করছেন, কেউ সংস্কৃতিকে বিকৃত করছেন, কেউ জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে বাগাড়ম্বরকে সাফল্যের মাপকাঠি মনে করছেন। সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য অনেকেই বাস্তবতার চেয়ে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে সত্য, শুদ্ধতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
আমাদের জাতীয় জীবনে মতের বৈচিত্র্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, সমালোচনা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা যদি শত্রুতা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তবে সমাজের ভেতরের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। নাগরিকতা তখন অধিকারভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, দায়িত্ববোধের চর্চা হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ; জোয়ার-ভাটার মতোই এ দেশের ইতিহাসেও উত্থান-পতন রয়েছে। কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যেতে হলে বিভাজনের রাজনীতি, অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি এবং অপসংস্কৃতির নানা উপাদান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ। নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনো কিছুই দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে না।
প্রশ্ন রয়ে যায়—আমরা কি সত্যিই একটি সহনশীল, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের পথে হাঁটছি, নাকি ধীরে ধীরে অপসংস্কৃতির গভীর খাদে নিমজ্জিত হচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজ আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নাগরিক দায়িত্ব।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯