শমশের আলম:
বাংলার গ্রামীণ সমাজ একসময় পরিচালিত হতো অলিখিত সামাজিক রীতিনীতি ও স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাবকে কেন্দ্র করে। সেই ব্যবস্থায় ‘মাতব্বরি’ কিংবা তথাকথিত ‘গ্রাম্য পলিটিক্স’ ছিল সামাজিক ক্ষমতার প্রধান উৎস। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ সমাজেও এসেছে নতুন বাস্তবতা। স্থানীয় সমিতি, সংঘ, যুব ক্লাব ও সমবায়ভিত্তিক সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে ঐতিহ্যগত ক্ষমতার কাঠামোর জায়গা দখল করেছে। উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে আরও সংগঠিত, গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নমুখী পথে এগিয়ে নেওয়া।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই পরিবর্তনের সব দিক সমানভাবে আশাব্যঞ্জক নয়। যে প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় সামাজিক উন্নয়ন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও জনকল্যাণের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর একটি অংশ আজ পুরোনো গ্রাম্য দলাদলি ও ক্ষমতার রাজনীতির নতুন রূপে পরিণত হয়েছে।
গ্রামীণ সমাজে ক্লাব ও সমিতির উত্থান হয়েছিল মানুষের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে। প্রবাসীদের অর্থায়ন, স্থানীয় জনগণের অবদান এবং যুবসমাজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বহু উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, এসব সংগঠন হবে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহির মডেল।
দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বহু সংগঠনে বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব বহাল থাকে। নিয়মিত নির্বাচন, নেতৃত্বের বিকাশ কিংবা নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিবর্তে গড়ে ওঠে একটি সীমিত গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। ফলে সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে সদস্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান না হয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের বাহনে পরিণত হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব। সদস্যদের চাঁদা, প্রবাসীদের অনুদান এবং সামাজিক কল্যাণের জন্য সংগৃহীত অর্থের যথাযথ হিসাব অনেক সময় সাধারণ সদস্যদের কাছে উপস্থাপন করা হয় না। নিয়মিত অডিটের অনুপস্থিতি, আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপন রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সদস্যদের বাইরে রাখা সংগঠনগুলোর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করছে। এর ফলে আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগও বাড়ছে।
একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি ও যোগ্যতার অবমূল্যায়নও অনেক সংগঠনের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতৃত্ব নির্বাচন বা দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে দক্ষতা, সততা ও কর্মক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য, সামাজিক প্রভাব কিংবা গোষ্ঠীগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে মেধাবী ও উদ্যমী তরুণদের একটি বড় অংশ সংগঠন থেকে দূরে সরে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক নেতৃত্বের সংকট তৈরি করে।
একটি সংগঠনের প্রাণশক্তি তার আদর্শ, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতিতে নিহিত। যখন কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব ব্যক্তি-স্বার্থে পরিচালিত হয়, তখন তার সামাজিক কার্যকারিতা দ্রুত ক্ষয়ে যায়। ফলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো অনেক সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
তবে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। প্রথমত, প্রতিটি সমিতি ও ক্লাবে নিয়মিত নির্বাচন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সদস্যদের সামনে প্রকাশ ও বাধ্যতামূলক অডিটের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সমিতি, সংঘ ও ক্লাবগুলো যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে সেগুলো গ্রামীণ পরিবর্তনের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। অন্যথায় কেবল নাম বদলাবে, কিন্তু পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সংস্কৃতি নতুন মোড়কে টিকে থাকবে।
তাই সময়ের দাবি হলো—গ্রামীণ সংগঠনগুলোকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের বলয় থেকে বের করে প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও দায়িত্বশীল সংগঠন সংস্কৃতিই পারে গ্রামীণ সমাজকে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিতে।
লেখক: প্রাক্তন ব্যাংকার, প্রতিবাদী লেখক ও সমাজচিন্তক।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড,
বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯