স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা: এক শ্রমিকের আত্মদান, এক জাতির জাগরণ
আতাউর রহমান:
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের আত্মত্যাগ জাতীয় জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। তেমনি এক অবিস্মরণীয় নাম শহীদ মনু মিয়া। তিনি শুধু বিয়ানীবাজার বা পঞ্চখণ্ডের গর্ব নন; তিনি ছিলেন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম শহীদদের অন্যতম, যার রক্তে সিক্ত হয়েছিল ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের রাজপথ।
আজ ৭ জুন। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা দাবির সমর্থনে দেশব্যাপী হরতাল চলাকালে আইয়ুব খানের শাসকগোষ্ঠীর গুলিতে শহীদ হন বিয়ানীবাজারের সন্তান মনু মিয়া। তাঁর আত্মদান শুধু একটি আন্দোলনকে বেগবান করেনি; বরং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি আরও দৃঢ় করেছে।
বিয়ানীবাজারের সন্তান থেকে জাতীয় বীর
ফখরুল দৌলা, যিনি সবার কাছে মনু মিয়া নামে পরিচিত, জন্মগ্রহণ করেন বিয়ানীবাজার উপজেলার বড়দেশ গ্রামে। পরে পরিবারসহ নয়াগ্রামে বসবাস শুরু করেন। পিতা মনোহর আলী ও মাতা রমজা বিবির সংসারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও জীবনের সংগ্রাম তাঁকে গড়ে তোলে কর্মঠ ও সচেতন একজন মানুষ হিসেবে।
জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় যান এবং একটি পানীয় কোম্পানির গাড়িচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু কেবল চাকরি করেই তিনি থেমে থাকেননি। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন তাঁকে রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে।
ছয় দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই কর্মসূচিকে বলা হয় বাঙালির "ম্যাগনা কার্টা" বা "মুক্তির সনদ"।
ছয় দফার মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তর করা, যেখানে পূর্ব পাকিস্তান স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ভোগ করবে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এই দাবিকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে দমন-পীড়ন শুরু করে। গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু। দেশজুড়ে শুরু হয় আন্দোলন।
৭ জুন: রক্তে লেখা ইতিহাস
১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা রেললাইন অবরোধ করে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও ইপিআর গুলি চালায়।
সেই গুলিতে আহত হন মনু মিয়া। প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রনেতা নুরে আলম সিদ্দিকীর ভাষ্যমতে, গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ও মনু মিয়া সংগ্রামের কথা বলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নিজের জীবনাবসানের মুহূর্তেও তিনি ব্যক্তিগত বেদনার চেয়ে আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে বড় করে দেখেছিলেন।
সেদিন ঢাকা, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মোট ১১ জন বাঙালি শহীদ হন। কিন্তু মনু মিয়ার আত্মদান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, কারণ তিনি ছয় দফা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে ওঠেন।
গুম হওয়া লাশ, অমর হয়ে থাকা নাম
আন্দোলনের প্রভাব কমাতে তৎকালীন সরকার অনেক শহীদের মতো মনু মিয়ার মরদেহও গুম করে দেয়। ফলে তাঁর লাশ আর পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি। তবে লাশ গুম করা গেলেও ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলা যায়নি।
১৯৬৬ সালের ৮ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনে তাঁর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর ৭ জুন ছয় দফা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়।
স্বাধীনতার পথে এক অনুপ্রেরণার নাম
ঐতিহাসিকভাবে ছয় দফা আন্দোলন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ রোপণের ঘটনা। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা নতুন মাত্রা পায় এবং স্বাধীনতার দাবি ক্রমে জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে মনু মিয়া শুধু একজন শ্রমিক নন; তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনুপ্রেরণার নাম, যিনি দেখিয়ে গেছেন আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ কতটা মহৎ হতে পারে।
স্মৃতির প্রতি অবহেলা, নাকি ইতিহাস বিস্মৃতি?
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ছয় দশক পরও শহীদ মনু মিয়ার স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই সীমিত। ঢাকার তেজগাঁও নাখালপাড়ায় তাঁর নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও দীর্ঘ সময় তাঁর নামে কোনো জাতীয় পদক, গবেষণা কেন্দ্র কিংবা উল্লেখযোগ্য স্মারক নির্মিত হয়নি।
অবশেষে প্রবাসী ও স্থানীয় কয়েকজন সচেতন মানুষের উদ্যোগে ২০১৭ সালে তাঁর বাড়িতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যে মানুষটি ছয় দফা আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসের অংশ, তাঁর অবদান কি আরও বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে না?
নতুন প্রজন্ম কি জানে মনু মিয়ার কথা?
আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠছে। তারা বঙ্গবন্ধুর নাম জানে, মুক্তিযুদ্ধের কথা জানে; কিন্তু কতজন জানে বিয়ানীবাজারের সেই শ্রমিকের কথা, যিনি স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন?
ইতিহাস শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের চেতনায়, শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে।
মন্তব্য
শহীদ মনু মিয়া পঞ্চখণ্ডের অহংকার, বিয়ানীবাজারের গর্ব এবং বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর আত্মদান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়; এটি সংগ্রাম, ত্যাগ এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত।
৭ জুনের এই দিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা প্রত্যাশা করি, নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবনাদর্শ থেকে সাহস, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেমের শিক্ষা গ্রহণ করবে।
মনু মিয়া শুধু ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার অভিযাত্রায় এক অমর প্রেরণা।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড,
বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯