পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক:
ভোটের আর মাত্র ছয় দিন বাকি। মাঠ যত উত্তপ্ত হচ্ছে, সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার–গোলাপগঞ্জ) আসনের রাজনীতি ততই এগোচ্ছে এক নীরব ও জটিল সমীকরণের দিকে। প্রকাশ্য প্রচারণা, প্রতীক কিংবা দলীয় শক্তির বাইরে গিয়ে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক পরিচয় ও নীরব ভোটব্যাংক। নৌকাবিহীন বাস্তবতায় আওয়ামী ঘরানার অদৃশ্য ভোট, ‘নিজের উপজেলার প্রার্থী’ ভাবনা এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে বিজয়ের ভাগ্য নির্ধারিত হবে ব্যালট বাক্স খোলার পরই।
জাতীয় সংসদের ২৩৪ নম্বর এই আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক রূপ নিচ্ছে। বিএনপির ঐক্যের বার্তা, জামায়াতে ইসলামীর মর্যাদার প্রশ্ন এবং উলামা ও আঞ্চলিক শক্তির সক্রিয় উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সিলেট-৬ এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৯২টি—গোলাপগঞ্জে ১০৩টি ও বিয়ানীবাজারে ৮৯টি। মোট ভোটকক্ষ সংখ্যা ১০১৩টি। মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ১৫৫ জন।
ধানের শীষে ঐক্যের জোর
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, ‘লাকিম্যান’ খ্যাত এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই ভোটের অঙ্কে এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দলীয় ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক, ঐক্যের বার্তা এবং একাত্তরের শক্তির নীরব সমর্থন ধানের শীষকে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজনৈতিক অবস্থান ও আঞ্চলিক সমীকরণ মিলিয়ে কাস্টিং ভোটের বিপুলসংখ্যক ধানের শীষ প্রতীকের ঝুলিতে যেতে পারে। তবে আঞ্চলিক মেরুকরণ ও নীরব ভোটের প্রবণতা এই হিসাব কতটা পাল্টাবে—তা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খোলা প্রশ্নই থাকছে।
জামায়াতের মর্যাদার লড়াই
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সেলিম উদ্দিন বিয়ানীবাজারের সন্তান এবং দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও আস্থাভাজন নেতা। সিলেট-৬ আসনকে দলটি তাদের জন্য একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে তেমনি চ্যালেঞ্জিং হিসেবেও দেখছে।
নির্বাচনী মাঠে নিজের অবস্থান শক্ত করতে তিনি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে উঠান বৈঠক, পথসভা ও ব্যক্তি-সংযোগে জোর দিচ্ছেন। দলীয় ভোটব্যাংক ধরে রাখার পাশাপাশি নিরপেক্ষ ভোটার এবং আওয়ামী ঘরানার একাংশকে আকৃষ্ট করার কৌশলও নিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আগের তুলনায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা এই আসনের লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলবে।
জাপা, স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী: ফল নির্ধারণের ফ্যাক্টর
বিএনপি জোটের বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী, জমিয়ত নেতা হাফিজ মাওলানা মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ‘হেলিকপ্টার’ প্রতীক, উলামায়ে কেরামের একটি বড় অংশের সমর্থন এবং রিভার বেল্ট এলাকায় তার প্রভাব—সব মিলিয়ে তিনি ভোটের সমীকরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ভোট বিশ্লেষকদের মতে, বিয়ানীবাজার পিএইচজি মাঠে ফুলতলী মসলকের ওয়াজ মাহফিলকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক ও বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোটের হাওয়া আংশিকভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে তিনি জয়ের দৌড়ে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্ত হয়ে কার্যকর ভোট-কাটার ভূমিকা রাখার অবস্থানে পৌঁছেছেন—যা শেষ পর্যন্ত এই আসনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুন নূর (লাঙ্গল) নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পুরোনো প্রতীক ও ব্যক্তিগত পরিচিতিকে পুঁজি করে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। অন্যদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের শরিক হলেও সিলেট-৬ আসনে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী এডভোকেট জাহিদুর রহমান (ট্রাক) স্বতন্ত্রভাবে প্রচারে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের একটি অংশ এই দুই প্রার্থীর দিকেও যাবে।
আঞ্চলিকতা ও নীরব ভোটের অদৃশ্য প্রভাব
এবারের নির্বাচনে আঞ্চলিক সমীকরণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ধানের শীষের প্রার্থীর বাড়ি গোলাপগঞ্জে হলেও বাকি চার প্রার্থীর বাড়ি বিয়ানীবাজারে। ফলে ‘নিজের উপজেলার প্রার্থী’ ভাবনা ভোটের অঙ্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগের নীরব ভোটব্যাংক সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ফ্যাক্টর হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। দলীয় নির্দেশনার অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক চাপ ও আতঙ্কে তারা প্রকাশ্যে অবস্থান না নিলেও শেষ মুহূর্তে তাদের সিদ্ধান্ত পুরো হিসাব পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে সিলেট-৬-এর নির্বাচন কোনো সরল দ্বন্দ্ব নয়। এখানে কাস্টিং ভোটের প্রায় ৭৮ শতাংশে ভাগ বসাতে পারে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হেলিকপ্টার প্রতীক—এই ত্রিস্তরীয় সমীকরণেই নির্ধারিত হতে পারে বিজয়ী। কাস্টিং ভোটের অবশিষ্ট প্রায় ২২ শতাংশ ভাগাভাগি হতে পারে অন্যান্য প্রতীকের মধ্যে।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা আঞ্চলিক পরিচয়, প্রতীক না-কি প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দেন—তার চূড়ান্ত উত্তর মিলবে ভোটের দিন, ব্যালট বাক্স খোলার পরই।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড,
বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯