পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক:
গোলাপগঞ্জ–বিয়ানীবাজার (সিলেট-৬)—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটিকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা, হিসাব-নিকাশ আর রাজনৈতিক কৌতূহল। এক কথায়, এটি এখন চ্যালেঞ্জের আসন। সময় যত গড়াচ্ছে, খেলাও তত জমছে। ফলাফল কী হবে—তা এখনো অজানা। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
‘লাকিম্যান’ এমরান ও বিএনপির ঐক্যের গল্প
বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী ইতোমধ্যেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন ‘লাকিম্যান’ হিসেবে। দলের ভেতরের একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে টপকে দলীয় মনোনয়ন আদায় করাই ছিল বড় চমক।
২১ জানুয়ারি সিলেট সফরে এসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আরও এক ধাপ এগিয়ে দেন ঐক্যের বার্তা। মনোনয়নপ্রত্যাশী সব নেতাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন—সিলেট-৬ এ বিএনপি এক ও অটুট।
বিশেষ করে বিয়ানীবাজার বিএনপি, যারা কিছুদিন আগেও ব্যাকফুটে ছিল—সেখানেও সফল এমরান। ফয়সল আহমদ চৌধুরীর নির্দেশনায় মান-অভিমান ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় নেতারা। দুই দিন আগের বৈঠকের পর মাঠের চিত্র পাল্টে গেছে। এখন এমরানের পক্ষে সবাই একাট্টা।
এই ঐক্যের বার্তাকে আরও জোরালো করে তুলে ধরেন বিয়ানীবাজার পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জনতার মেয়র আবু নাসের পিন্টু। তিনি বলেন, “মনোনয়ন প্রত্যাশা করা রাজনীতির স্বাভাবিক বিষয়। দল যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন আর দ্বিধার কোনো সুযোগ নেই। ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতেই মাঠে নামতে হবে। যারা মনোনয়ন প্রত্যাশীসহ সকল সমর্থকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়। নিজেদের স্বার্থ নয়, দলের স্বার্থে; নিজেদের অবস্থান নয়, দলের অস্তিত্ব রক্ষায়—ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। ঐক্য থাকলে জয় আসবেই, ইনশা আল্লাহ। ”
জামায়াতের চমক প্রার্থী সেলিম উদ্দিন
অন্যদিকে, এই আসনে বড় চমক জামায়াতের প্রার্থী পরিবর্তন। প্রথমে একক প্রার্থী ছিলেন সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদলে তিনি সিলেট-১ এ চলে যান।
সিলেট-৬ এ আসে নতুন নাম—ঢাকা উত্তর জামায়াতের আমীর সেলিম উদ্দিন। বিয়ানীবাজারের সন্তান, সংগঠনের ভেতরে ভীষণ আস্থাভাজন। তাকে নিয়ে বাজি ধরেছে জামায়াত নেতৃত্ব।
জামায়াত ইতোমধ্যে সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে ৩টি ছাড় দিয়েছে। হাতে থাকা বাকি ৩টির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং আসন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সিলেট-৬। তাই এখানে জয় পেতেই হবে—এমন মনোভাব নিয়েই সর্বশক্তি মাঠে নামিয়েছে দলটি।
মাঠে কর্মী, নজরে নিরপেক্ষ ভোট
হাজার হাজার কর্মী মাঠে নামিয়েছে জামায়াত। সেলিম উদ্দিন ইতোমধ্যে নিজ দলের ভোট ব্যাংকে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। এখন তার মূল লক্ষ্য নিরপেক্ষ ভোটার। এ লক্ষ্যে তিনি কৌশলী ও সতর্ক।
সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক সিলেটে এলে তাকে নিজ আসনে নিয়ে যান সেলিম উদ্দিন—যা রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ভাইরাল বক্তব্য ও পাল্টা সতর্কতা
তবে নির্বাচনী উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে একটি ভাইরাল বক্তব্য। মামুনুল হককে পাশে বসিয়ে সেলিম উদ্দিন বলেন—
“আমি নির্বাচিত হলে এসপি, ওসি আমাকে না জানিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না।”
এই বক্তব্য ঘিরে ভোটারদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কী বার্তা দিতে চাচ্ছেন?
এর পাল্টা জবাবে বিএনপির প্রার্থী এমরান চৌধুরী কঠোর ভাষায় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলেন—
“আমার প্রতিপক্ষের বক্তব্য আপনারা বুঝতে পারছেন। উনি নির্বাচিত হলে আপনারা বাড়িতে থাকতে পারবেন না। তাই এখনই ধানের শীষের বিজয়ের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
বিদ্রোহী, আওয়ামী ভোট ও বাস্তব হিসাব
এ আসনে বিএনপি জোটের বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে আছেন জমিয়ত নেতা ফখরুল ইসলাম। তিনি রিভার বেল্ট ও উলামাদের একাংশের ভোট টানতে পারেন—তবে সেটি খুব বড় ফ্যাক্টর নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিলেট-৬ আসনের এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বাইরে মাঠে রয়েছেন আরও দুই প্রার্থী। গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট জাহিদুর রহমান (ট্রাক) এবং জাতীয় পার্টি মনোনীত আব্দুন নূর (লাঙ্গল) নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে নতুন ভোটার ও নিরপেক্ষ ভোটারদের অবস্থানই শেষ মুহূর্তে ভোটের সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে পাল্লা—তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত।
এখানকার আওয়ামী লীগের রয়েছে বড় ভোট ব্যাংক। তবে সেটি এখনো স্থির। জামায়াত চেষ্টা করছে সেই ভোটে ফাটল ধরাতে—কিন্তু কাজ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সচেতন ভোটার, বাড়ছে শঙ্কা
সিলেট-৬ এর ভোটাররা অন্য আসনের মতো নয়। এটি একটি শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনপদ। বহিরাগতদের গতিবিধি বাড়ায় শঙ্কাও বাড়ছে। অনেক অচেনা মুখ এলাকায় যাতায়াত করছে। চোখ রাঙানির ইঙ্গিত মিলছে—যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শেষ কথা
সব হিসাব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে,— বিএনপি যদি ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে সব সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। অপরদিকে জামায়াতের জন্য এটি মর্যাদার লড়াই। প্রশাসনের কড়া নজর, ভোটারদের সতর্ক দৃষ্টি—সব মিলিয়ে সিলেট-৬ এখন পুরো দেশের আলোচনার কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত কার হাসি ফুটবে—এমরান না সেলিম? উত্তর দেবে ব্যালট।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড,
বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯