পঞ্চখণ্ড আই প্রতিবেদক:
সিলেট-৬ আসনের এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একাধিক অদৃশ্য ফ্যাক্টরের সমন্বিত পরীক্ষা। নৌকাবিহীন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের নীরব ভোটব্যাংক যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি আলোচনায় এসেছে আঞ্চলিকতা ও প্রতীকভিত্তিক মনস্তত্ত্ব।
প্রার্থী পাঁচজন হলেও মাঠের লড়াই মূলত বহুমুখী—রাজনৈতিক পরিচয়, সংগঠনের শক্তি, ব্যক্তিগত ইমেজ এবং এলাকার মানুষ ‘নিজের লোক’ কাকে ভাবছেন, তার ওপর নির্ভর করছে সমীকরণ।
আঞ্চলিকতা: নীরব কিন্তু প্রভাবশালী ফ্যাক্টর
এবারের নির্বাচনে আঞ্চলিক সমীকরণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ধানের শীষের প্রার্থী এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীর বাড়ি গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। বিপরীতে বাকি চার প্রার্থীর বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলায়। স্থানীয় পর্যায়ে এই বিষয়টি ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে বিয়ানীবাজারে “নিজের উপজেলার প্রার্থী” ভাবনাটি স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে। তবে গোলাপগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এই আঞ্চলিক ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আওয়ামী শূন্যতা, কিন্তু ভোটারের উপস্থিতি
নৌকা প্রতীক না থাকলেও সিলেট-৬ এ আওয়ামী লীগের ভোটাররা অদৃশ্যভাবে সক্রিয় ফ্যাক্টর। তৃণমূলে দলটির নেতাকর্মীরা হাই কমান্ডের নির্দেশ ছাড়া ভোট নিয়ে কোনো অবস্থান নিচ্ছেন না। গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের আরও সতর্ক করেছে।
এই নীরবতা প্রার্থীদের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি ঝুঁকিও। কারণ, এই ভোটাররা শেষ মুহূর্তে ভোটকেন্দ্রে না গেলে বা ছড়িয়ে পড়লে পুরো হিসাবই উল্টে যেতে পারে।
জামায়াতের আক্রমণ ও আশ্বাসের রাজনীতি
জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে মাঠে আছে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ায় দলটি উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি সামনে আনছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো—আওয়ামী ঘরানার ভোটারদের প্রতি জামায়াতের আশ্বাস। নৌকায় ভোট দেওয়ার কারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না—এই বার্তা দিয়ে তারা সেই নীরব ভোটব্যাংকে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এটি তাদের কৌশলগত শক্তি বাড়ালেও ভোটের দিন এর কার্যকারিতা কতটা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিএনপি: সংগঠন বনাম আস্থা
ধানের শীষের প্রার্থী এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীর পক্ষে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে মাঠে নেমেছে। ওয়ার্ডভিত্তিক কেন্দ্র পরিচালনা কমিটি, দলীয় কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ এবং একমঞ্চে ঐক্যের বার্তা তৃণমূলে প্রভাব ফেলছে।
তবে আওয়ামী ঘরানার ভোটারদের কাছে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ আস্থার প্রশ্ন। মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে কঠোর বক্তব্য একদিকে প্রশাসনিক দৃঢ়তার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে আতঙ্কগ্রস্ত ভোটারদের দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে।
‘হেলিকপ্টার’ ও আবেগের রাজনীতি
স্বতন্ত্র প্রার্থী হাফিজ মাওলানা মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এই নির্বাচনের সবচেয়ে অনিশ্চিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। হেলিকপ্টার প্রতীক, আঞ্চলিক ভাষায় আবেগঘন বক্তব্য এবং দীর্ঘদিন মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
তিনি সরাসরি জয়ের দৌড়ে না থাকলেও জামায়াত ও বিএনপির সম্ভাব্য ভোট কেটে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন—যা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাক ও লাঙ্গল: প্রচেষ্টায় পিছিয়ে, উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী এডভোকেট জাহিদুর রহমান (ট্রাক) ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুন নূর (লাঙ্গল) প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও মাঠ গোছাতে তুলনামূলকভাবে বেগ পাচ্ছেন। তবুও নির্দিষ্ট কিছু ভোটারভিত্তি ও প্রতীকের পরিচিতি তাদের সম্পূর্ণভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে রাখছে না। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির প্রচারণা জোরেশোরে চলায় ভোট ভাগের সমীকরণে লাঙ্গলও একটি বিবেচ্য উপাদান।
শেষ প্রশ্ন, শেষ হিসাব
সব মিলিয়ে সিলেট-৬ এর নির্বাচন কোনো সরল দ্বন্দ্ব নয়। এখানে প্রতীক, আঞ্চলিকতা, রাজনৈতিক বার্তা, সংগঠনের শক্তি এবং সবচেয়ে বড় করে নীরব আওয়ামী ভোটব্যাংক—সবকিছুর সম্মিলিত পরীক্ষা চলছে।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা আঞ্চলিক পরিচয়, প্রতীক না কি প্রতিশ্রুতি—কোনটিকে প্রাধান্য দেন, সেটিই নির্ধারণ করবে কে এগিয়ে থাকবে, কে পিছিয়ে পড়বে। আর সেই উত্তর মিলবে কেবল ভোটের দিন, ব্যালট বাক্স খোলার পর।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড,
বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯