— Π আতাউর রহমান
আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘ ছত্রিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার নানা বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান—এই তিন পক্ষের প্রত্যাশা, সীমাবদ্ধতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে একই স্কুলে, একই শ্রেণিতে পড়লেও প্রতি বছর কেন পুনঃভর্তি ফি নেওয়া হয়—এ নিয়ে অভিভাবকদের বহুল আলোচিত প্রশ্নের কিছু বাস্তবভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরাই এই উপসম্পাদকীয়র উদ্দেশ্য।
অনেক অভিভাবকের প্রশ্ন—শিক্ষার্থী তো নতুন কোথাও যাচ্ছে না, শ্রেণিও একই, তাহলে পুনঃভর্তি ফি কেন? প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়। তবে শিক্ষা কার্যক্রমকে যদি একটি ধারাবাহিক কিন্তু পৃথক পৃথক সেশনের সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বিষয়টি কিছুটা স্পষ্ট হয়।
প্রতি শিক্ষাবর্ষ শুরু মানেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন প্রশাসনিক ও একাডেমিক অধ্যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন করে হাজিরা রেজিস্ট্রার, কৃতকার্য ও অকৃতকার্য তালিকা, বার্ষিক শিক্ষা সেশন ক্যালেন্ডার, শ্রেণি রুটিন, পরীক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হয়। এগুলো আগের বছরের কাগজে চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের আলাদা নথি, আলাদা হিসাব ও আলাদা দায়বদ্ধতা থাকে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) হালনাগাদ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষাসফর, সহশিক্ষা কার্যক্রম—সবই নতুনভাবে পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত হয়। এসব কার্যক্রম পরিচালনায় কাগজপত্র, প্রিন্টিং, লজিস্টিকস, জনবল ও সময়ের ব্যয় হয়। পুনঃভর্তি ফি’র একটি অংশ সাধারণত এই প্রশাসনিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হয়।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর শিক্ষার্থীর অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়—কে উত্তীর্ণ, কে অনুত্তীর্ণ, কার তথ্য পরিবর্তিত হয়েছে, কার বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। এই যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই শিক্ষার্থী নতুন সেশনে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পুনঃভর্তি প্রক্রিয়া মূলত এই প্রশাসনিক পুনর্নবীকরণেরই অংশ।
তবে দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে এটাও বলতে চাই—সব দায় কেবল অভিভাবকদের বোঝার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুনঃভর্তি ফি’র পরিমাণ ও ব্যয়ের খাত স্পষ্টভাবে জানানো হয় না, যা অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব আরও বেশি। ফি নির্ধারণে যুক্তিসংগত সীমা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং অভিভাবকদের অবহিতকরণ নিশ্চিত করা না গেলে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
নীতিনির্ধারকদের প্রতিও আমার অনুরোধ—পুনঃভর্তি ফি যেন কখনোই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ওপর বাড়তি চাপ বা বৈষম্যের কারণ না হয়। আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহে বাস্তবসম্মত সুযোগ পায়—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে—শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতি বছর নতুন পরিকল্পনা, নতুন ব্যবস্থাপনা ও নতুন দায়বদ্ধতার দাবি রাখে। মানসম্মত শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখতে কিছু বাস্তব ব্যয় অনিবার্য।
সবশেষে বলতে চাই, পুনঃভর্তি ফি নিয়ে দ্বন্দ্ব নয়—প্রয়োজন স্বচ্ছতা, যুক্তি ও পারস্পরিক আস্থা। প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারক—এই তিন পক্ষের সমন্বিত বোঝাপড়াই পারে শিক্ষার্থীকে একটি সুস্থ, মানবিক ও টেকসই শিক্ষা পরিবেশ উপহার দিতে।
শিক্ষার স্বার্থেই এই ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আতাউর রহমান
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী
বানিজ্যিক কার্যালয়: সমবায় মার্কেট, কলেজ রোড,
বিয়ানীবাজার পৌরসভা, সিলেট থেকে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।
ই-মেইল: 𝐩𝐚𝐧𝐜𝐡𝐚𝐤𝐡𝐚𝐧𝐝𝐚𝐞𝐲𝐞@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦 মোবাইল নম্বর: ০১৭৯২৫৯৮১২৯